অঘ্রান রাত কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ১১তম খণ্ডে রচিত। যা ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

অঘ্রান রাত
কবিতা: অঘ্রান রাত
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

বিষণ্ন অঘ্রান-রাত ফিরে এল আবার এ গোল পৃথিবীতে
নগরীর ফুটপাতে আমার পায়ের সেই অন্তহীন পায়চারি জোর পেল
সময়ের ঘড়িকে উপেক্ষা ক’রে পুনরায়
মরা-গঙ্গা’র ধূম্র সৈকতের থেকে ফের এসপ্লানেডের দিকে যাওয়া যায়
আবার নদীর দিকে হাওড়া’র সেতুর নিকটে
যেন এক ববিনের সূতা খুলে- সূতা খুলে
তবুও ববিন থাকে শোথের রুগির মতো ফুলে
মস্তিষ্কের সব কাজ নীরবে জুড়ায়ে গেছে হৃদয়ের ভবিষ্যতহীন ধর্মঘটে
জাহাজ, প্রাসাদ, কুঁড়ে, ক্বাথ নিয়ে বড়ো নগরীকে
এক বার দেখা যায় নির্মিতের মূঢ় কৌশলের মতো শুধু
সৃষ্টি নয়- নির্মাতারা সব
মৃত সরীসৃপদের মতো বালুকার ভিতরে নীরব
লক্ষ বৎসর-কাল হয়তো-বা- এখন এমন অনুভব।
পুনরায় মনে হয় হেমন্তের অরণ্যের আধো-অন্ধকারে
চলেছি চিতা’র মতো চিত্রিত ছালের আচ্ছাদনে
মধ্যপথ ছেড়ে দিয়ে- ডান দিকে বাঁয়ে
বাঘের উচ্ছিষ্ট ঘ্রাণ গায়ে
তবুও সে আপনাকে টের পায় সহসা দুপুর-রাতে শাপবিমোচনে
যখন অনেক শিশু- অনেক ছায়ার শিশু নগরীর
দুগ্ধ খেতে আসে তার অন্ধকার দুরারোহ স্তনে
এসপ্লানেডের থেকে সারসের মতো ভেসে চ’লে যাই দক্ষিণের দিকে
কোনও এক নিরুপম গুলি যদি তাহার হৃদয়ে লেগে যেত
তা হলে সে ক্যাসানোভা- মেট্রো- ফার্পো- মেঘ- মারুতির
হৃদয়ে সোনালি খড় পেয়ে যেত- সাদা ডিম- নীড়
এখন আলেখ্যহীন ধূসরতা শুধু
এক অসত্যের থেকে ভেসে যাই অন্য এক অস্পষ্ট অলীকে।
তবুও থামিতে হয় উন্মুখ গতির মাঝপথে
কোনও এক ঝিলমিল পাথরমূর্তির কাছে এসে
ঘোড়া’র উপরে চ’ড়ে যেন দূর পরির নির্দেশে
এমন নিথর হয়ে রয়েছে সে শিশিরের শুক্ল কোলাহলে
সর্বদাই সদ্যঃপাতি বস্তুর জগতে
তবুও সে ধীরে-ধীরে চ’লে যায়
যেন সব মৃত্যু, বেগ, রক্তকণিকার গতি, দ্রুততর অনুভব, উন্মেষ,- অন্যায়।

যেন তার ঘোড়া চুপে হয়ে গেল জেরুজালেমের ক্ষুদ্র গাধা
তাহার শরীর, রোম হয়ে গেল নিগ্রো’র মতো কৃষ্ণকায়
আমার অদ্ভুত আত্মা: শ্বেত ঘোড়া,- অশ্বারোহীর মতো সাদা।
করতলে এ-রকম সমুদ্রসবুজ স্নিগ্ধ আমলকী নিয়ে
পৃথিবীর মানুষের ঘড়িধরা সময় হারিয়ে
এখন এসেছি আমি নগরীর মানচিত্রে কোন পথে ফিরে
এ-পথে আসি নি আমি কোনও দিন
এ-পথে এসেছি আমি চির-দিন
একটি দেয়াল ছুঁয়ে আকাশের হাওয়া থেকে মানুষের অন্তঃসারবর্তী শরীরে
ফিরে আসি- অসংখ্য প্রমথ আসে আমার পিছনে ফিরে-ফিরে
এইখানে সময়ের ঘড়ি তবে বহমান
সর্বদাই ক্লোরোফর্মের ঘ্রাণ
অনেক মানুষ আছে লুপ্ত হয়ে বিছানায় তবে
হাসপাতালের সব অভিজ্ঞ ডাক্তার, নার্স- নিসর্গও- জানে না ক’ কোন্ কাজ বিকশিত হবে
একটি দুরূহ গন্ধ ঘুরে-ঘুরে অন্ধকারে কাজ ক’রে যেতেছে নীরবে
কোথাও জলের গ্লাস- আলো- ছবি- অনেক বাতাবিফুল আছে
কোথাও রয়েছে প্রেম- কুরু-রমণীর মতো সমীচীন চোখ ও চিবুক
আমাদের হাড়ের ভিতরে তারা সাদা সমাধির মতো স্থির
কস্তূরীর মতো নীল জ্যোৎস্নায় অন্য নগরীর
এ-ঘড়ির মৃত্যু হলে যাহাদের জন্ম হবে দূর ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে
তারা এক সরলতা ফিরে পাবে- জীবনের- মৃত্যুর
আজ রাতে আমাদের প্রেম তবে সেই শঠ বাতাসের ধ্বনি
যত কাছে চ’লে আসে মনে হয় আরও তত দূর
কারণ আমরা আজ অসরল- বিশদ- প্রচুর।
মনে হয় আমাদের এ-তিমির: বন্দরের বেলোয়ারি রৌদ্রের মতন
এই নীরবতা যেন সর্বদাই লস্করের কালোয়াত- জাহাজে বালতির আলোড়ন
তবুও সকলে মৃত- সর্বদাই বড়ো রৌদ্রে সিঁড়ি বেয়ে আত্মাদের নরকে গমন।