বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্য ও নাট্যজগতে আজিজুর রহমান একজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক ও নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত। তিনি কবি, গীতিকার এবং নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিলেন। তার সাহিত্যকর্ম ও নাট্যচর্চা বাংলাদেশের পাঠক এবং দর্শক সমাজের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
জীবন ও শৈশব
আজিজুর রহমান ১৯১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বশির উদ্দিন প্রামানিক এবং মাতার নাম সবুরুন নেছা। শিশুবয়সে পিতার মৃত্যু হওয়ার ফলে তার শিক্ষাজীবন প্রাথমিক পর্যায়েই বাধাগ্রস্ত হয়।
শিশুকাল থেকেই তিনি স্থানীয় যাত্রা ও নাটকের দলে যুক্ত হন। এখান থেকেই তার সাহিত্য ও নাট্যপ্রবণতার সূচনা ঘটে। নাটক ও সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ তাকে সাহিত্যচর্চার দিকে উৎসাহিত করে।
সাহিত্যিক কার্যক্রম
১৯৩৮ সাল থেকে আজিজুর রহমান তৎকালীন বিভিন্ন পত্রিকায় তার লেখা কবিতা, গান ও সাহিত্যিক রচনা পাঠানো শুরু করেন। তাঁর লেখা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হত সওগাত, মোহাম্মদী, আজাদ, নবশক্তি, আনন্দবাজার, ভারতবর্ষ, বুলবুল, শনিবারের চিঠি প্রভৃতি পত্রিকায়।
এই সময় থেকেই তিনি কুষ্টিয়ার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নিজস্ব উপস্থিতি তৈরি করতে শুরু করেন। কবিতা, গান এবং ছোটগল্পের মাধ্যমে তিনি পাঠক সমাজের মধ্যে সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটান।
নাট্যচর্চা
আজিজুর রহমান কুষ্টিয়ায় একটি নাট্যদল গঠন করেন এবং এতে নিজেও অভিনয় করেন। তাঁর নাট্যদল শিলাইদহের ঠাকুর বাড়িতে নাটক মঞ্চস্থ করত। এই কর্মকাণ্ড শুধু স্থানীয় সাংস্কৃতিক জীবনে অবদান রাখেনি, বরং বাংলা নাট্যসংস্কৃতির ধারাবাহিকতায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নাট্যদলের মাধ্যমে তিনি নাট্যশিক্ষা, অভিনয় এবং সাংস্কৃতিক চর্চাকে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। এছাড়া তিনি স্থানীয় যুব সমাজকে নাট্যকলা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন।

আজিজুর রহমান প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ তালিকা

গান
- ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায় রে,
- কারো মনে তুমি দিও না আঘাত, সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে ,
- আকাশের ঐ মিটি-মিটি তারার সাথে কইবো কথা, নাই বা তুমি এলে,
- পৃথিবীর এই পান্থশালায়, হায় পথ ভোলা কবি,
- আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি,
- বুঝি না মন যে দোলে বাঁশিরও সুরে,
- দেখ ভেবে তুই মন, আপন চেয়ে পর ভালো,
- পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমারই দেশ ভাই রে প্রভৃতি।

গ্রন্থ
- ডাইনোসরের রাজ্যে (১৯৬২)
- জীবজন্তুর কথা (১৯৬২)
- ছুটির দিনে (১৯৬৩)
- এই দেশ এই মাটি (১৯৭০)
- উপলক্ষের গান (১৯৭০)
আজিজুর রহমান একজন প্রতিভাবান কবি, সাহিত্যিক ও নাট্যব্যক্তিত্ব, যিনি ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে কুষ্টিয়ার সাহিত্য ও নাট্যচর্চাকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছেন। তার কবিতা, গান ও নাট্যচর্চা স্থানীয় সমাজে সাংস্কৃতিক চেতনা জাগ্রত করেছে। তিনি শুধু একজন লেখক নন, বরং বাংলা সাহিত্যের এবং নাট্যসংস্কৃতির ধারাবাহিকতার গুরুত্বপূর্ণ বাহক হিসেবেও স্মরণীয়।
১ thought on “আজিজুর রহমান: জীবন, সাহিত্য ও নাট্যচর্চা”