দীর্ঘ এক দেবদারুগাছের নিকটে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

দীর্ঘ এক দেবদারুগাছের নিকটে কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ৭ম খণ্ডে রচিত। যা ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

 

দীর্ঘ এক দেবদারুগাছের নিকটে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

দীর্ঘ এক দেবদারুগাছের নিকটে

কবিতা: দীর্ঘ এক দেবদারুগাছের নিকটে
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

 

দীর্ঘ এক দেবদারুগাছের নিকটে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

– দীর্ঘ এক দেবদারুগাছের নিকটে

সাদা ঘোড়া বেঁধে তুমি রেখেছ দুপুরে
চল্লিশ বছর কাল কাটালে এ-পৃথিবীতে
তবুও স্থবির নও, তবু তুমি যুবা নও
যদি বলি ত্রিশঙ্কু’র মতো তুমি-
তোমারে দেখিলে- আহা- ছেলেবেলাকার
গল্পের বইয়ের কথা মনে পড়ে।
হেমন্তের বেলা পড়িবার আগে যখন সহসা মাঠ থেকে
ঘরের হৃদয়কোষে চ’লে যেতে হত
বাইরের প্রান্তরের নারকোলগাছে
কোরা-দম্পতির ডাক শুনিতাম

শূন্য থেকে দূর শূন্য ফুঁড়ে
উঠিতেছে- শিয়রে একটি বাতি রেখে বিছানায় শুয়ে
কোনও এক আবছায়াস্তমিত প্রদেশে ফুরায়ে যেতাম
সাতটি বামন আর বালিকার গল্পে মনে আছে
দু’-চারটে পাখি- দু’-চারটে প্রণয়ীর দেখা পাওয়া যেত
অদ্ভুত গাছের গুঁড়ি- জনরবহীন দেশ- জ্যোৎস্না-
নিশীথের মৃত নদীটির ভাষা: প্রভাতের বায়সীর মতো যেন-

– সেই সব দিন তোমারও হৃদয়ে আজ ফুরায় নি- দেখি-

– ফুরায়েছে
প্রায়-অর্ধ শতাব্দীর মতো আমিও তো কাটালাম পৃথিবীতে
বয়ঃসন্ধি দিবসের মর্যাদাকে সন্তর্পণে অগোচর শেলফে রেখে দিয়েছি অনেক দিন
সেইখানে দু’-একটা সে-সব দিনের ধূসর চায়ের কাপও আছে
তাহাদের বুকে ফাটলের রেখা- আঁধার গলির মতো-
বন্দরের কাজের চাকায় ঘূর্ণ্যমান
বছরের পর বছরের ফাঁকে অকস্মাৎ তাহারে দেখিলে
কোনও এক দিগন্তরে নিয়ে যেতে চায়
এ-বিবাহ- এই সব সন্তানের দল-
আমার কলম- আজকের প্রভাতের চায়ের পেয়ালা: তার কাছে মেদ শুধু।

– তবুও তো তুমি- জানি আমি- পৃথিবীতে কাজ ক’রে সুখী
চাকরের দেশে- মধ্যবিত্ত ঘরে জ’ন্মে- খেদ নিয়ে- তবু স্বপ্ন ছেড়ে দিয়ে
নিষ্পলক প্রতিভার উচ্ছৃঙ্খল সন্তাপের মধ্যে গিয়ে
সব-চেয়ে নীরক্ত মেয়েকে তুমি বিবাহ করেছ।
সব-চেয়ে নির্জীব সন্তান- শহরের বাদল-রাত্রির পথে খোলা খোঁড়লের মতো
ট্রামের লাইনের স্টিলটাকে যেন ঘিরে আছে-

– শান্তি… শান্তি…

– শান্ত- স্তব্ধ- তুমি শক্ত ইস্পাতের মতো আজ- তুমি- আমি-

– তুমিও কি?

– আমি- তুমি- সকলেই।
আফিমের বাটি তুলে নিয়ে শরীরকে হত্যা করি নাই কেউ।
ছোটবেলা যেই সব স্বপ্ন আমাদের হৃদয়কে সুগঠিত করে দিয়ে গেছে
আজ তাহাদের কোনও কানাকড়ি মূল্য নাই পৃথিবীর কাছে- জানি আমি
বহুবিধ কাজে মানুষ ব্যাপৃত আজ
আমিও অনেক দিন ইতিহাস প’ড়ে পৰ্যাকুল চিন্তায় কাটায়েছি
মানুষেরা যে-সব জিনিস ভালোবেসে- ব্যঙ্গ ক’রে- অথবা ঘৃণায় হাতে তুলে নেয়
(তা না হলে ইতিহাস তার ঘূর্ণমান পরিধির স্পন্দন হারায়ে ফেলে
কোনও এক দাবাগ্নির মুখে এসে মানবের পঙ্গপাল-অভিযান
ম’রে যায়- পিঁপড়ের মাকড়ের হাতে সভ্যতার পরিচ্ছন্ন মূলসূত্র ছেড়ে দিয়ে)
আমিও সে-সব বস্তু বছর বিশেক হল প্রায়

কোনও এক কলেজের ধূসর গোহালে কাজ নিয়ে
একে-একে গ্রহণ করেছি সব- শরীরকে কিছুতেই বধ করি নাই
রাত জেগে যেই সব বই পড়াশোনা করি (পুরোনো স্বপ্নের বই নয় আর)
আবার বালক হয়ে জন্মাব যখন- কোনও এক হেমন্তের মাঠে- হয়তো-বা অন্য কোনও গ্রহে
জন্মাবই- তখন সে-সব বই- অথবা বইয়ের চেয়ে বড়ো:
সে-সব গাছের গুঁড়ি,- উঁচু-উঁচু মাস্তুলের মতো গাছ- কালো পাথরের সেতু-
জনরবহীন দেশ- বালিকা- জ্যোৎস্না-

 

দীর্ঘ এক দেবদারুগাছের নিকটে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

নিশীথের মৃত নদী প্রভাতের মৃত বায়সী’র মতো: ইহাদের সাথে মুখোমুখি দেখা হবে
তবু আজ রাত জেগে যেই সব বই পড়ি
যেই সব নিস্তব্ধ ধূসর পাতার ভিতরে
চোখ-চেনা ঢের স্বজনের ঠ্যাং
বেসাতির মুর্গির মতো পিপাসায় ভেঙে পড়ে
মনে হয় যেন আমাদেরই অন্য বন্ধুদের অন্ত্রের আঁধারে
এই সব পাখি উর্বশী’র মতো নাচিতেছে- রুদ্ধ হয়ে
উর্বশী;- উর্বশী নয়
বাতাপী- বাতাপী ব’লে ডাকো তো হৃদয়
তবুও ইল্লোল নই মোরা কেউ- বিন্ধ্যপর্বতের ফাল সূচ ক’রে দিয়ে
অগস্ত্যও চ’লে গেছে বহু দিন বালখিল্যদের ছেড়ে
অনেক অনেক রাত-পরিধির কঠিন সমুদ্রে
বামনের মতো সন্তরণ ক’রে
সন্দিহান কলেজের মাসিক তিরিশ টাকা বেতনকে তিন-শো টাকার মতো যেন মনে ক’রে
মোমের চর্বিত অহঙ্কার;

টেবিলের ‘পরে বই ফেলে রেখে আমিও অনেক ক্ষণ পথের প্রবাদে ঘুরি
বাহির হবার দিন রক্তে জমিতেছে- সকলের
চারি-দিকে বিশ্রুত কাঁকরে
নিরন্তর নিরভিমানিক পায়ের বিমূঢ় বিকল হলদে শব্দ শুনি
কারা হাঁটিতেছে এত- এই হিমানীর রাতে-
প্রথম পৃথিবী থেকে আজ এই কালো রাত এক
যত বোঝা জমেছিল- সব যেন ছালার ভিতরে ভ’রে নিয়ে
সহিষ্ণু চাষার মতো কাঁধে ফেলে বিচ্ছিন্ন ক্ষুরের শব্দে চলিতেছে
যুবক- বালক- শিশু- তরুণী- স্থবির-
বিবর্ণ এঞ্জিন থেকে খসা যেন ইস্পাতের চাদরের মতো
শীতের রাতের নিরুদ্দেশ প্রধান বাতাসে
কোনও এক অন্ধকার চুম্বকগিরির কোলে গিয়ে থামিতেছে।

– জানি আমি।
প্রত্যেকেই এরা পৃথক মানুষ- অথবা মানুষী
ব্যক্তির ব্যথার কথা ভেবে কোনও লাভ নেই
মানুষের… শক্তি চির-কাল মাছির মতন
হয়তো-বা কুলের আচারে- (বুড়ো মানুষের) শীত পোহাবার নিরীহ আগুনে
কিংবা ফাঁদে- দুরন্ত শিশুর হাতে- উনুনের লেলিহান জিঘাংসায় ম’রে ভূত হয়ে যায়

তবু এই মৃত্যু- মৃত্যু
কিংবা যারা স্পেন- চীন- আবিসিনিয়ার থেকে ঢের দূর
লেজেন্ডারি সপ্ত-সমুদ্রের আরও দূর দিগন্তের পারে ব’সে
স্থূল কামানের মুখে না এসেই বেঁচে আছে?
বেঁচে আছে আগুনের কুণ্ডের ভিতর লোকোত্তর গোধিকা’র মতো।
এই সব হেঁয়ালির মুখে দক্ষিণ সিন্ধুর পারে জাঞ্জিবর-লবঙ্গের মতন অমোঘ
মানবের ঘন ইতিহাস এনে আঘাত করিতে হয়- কে করিবে!

– আমাদের সন্ততিরা? হয়তো-বা আমরাই।

 

Leave a Comment