নব নব সূর্যে কবিতাটি মনবিহঙ্গম কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। এই কাব্যগ্রন্থ টি কবি জীবনানন্দ দাশের রচিত কাব্যগ্রন্থ । যা কবির মৃত্যুর অনেক বছর পর ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয়। এ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের বহু আগে ১৯৫৪-এর ২২ অক্টোবর এক ট্র্যাম দুর্ঘটনায় আহত হয়ে জীবনানন্দ লোকান্তরিত হয়েছিলেন। এই কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ৩৮ টি কবিতা স্থান পেয়েছে।

নব নব সূর্যে
কবিতা: নব নব সূর্যে
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

মানুষ সার্থক হয় মাঝে-মাঝে, তবু
কতো তার নিষ্ফলতারাশি
এখনো উজ্জ্বলতর ব’লে মনে হয়
মৃত ম্যামথের পাশাপাশি
মানবকে, তবুও নিরবচ্ছিন্ন ব্যক্তির জীবন
চারিদিকে ক্ষয় হ’য়ে আসে;
সকালের সম্ভাবনা মানুষকে সচকিত করে;
আলো ঠিকরালে তবু চোখে এসে পড়ে
শেষ শূন্য- কিছু নেই, বিকেল নিভছে।
যারা আশা করেছিলো, কিংবা যারা আশা
করে নাই, যারা প্রাণে ভালোবাসবার
জ্ঞানী পরিভাষা
আয়ত্ত না ক’রে তবু প্রেম
চেয়েছিলো প্রিয় নরনারীদের কাছে
যারা শুধু বাঁচবার পথ চেয়েছিলো…
শিশিরে নিঃশব্দ হ’য়ে আছে।
সাধনায় হয়তো বা সত্য শুভ লাভ
হ’তে পারে- এরা কেউ-কেউ
সেই আভা দেখেছিলো, তবু
অন্ধ অন্নসমস্যার ঢেউ
এসে সব মুছে ফেলে গেছে
ঘর বাড়ি সাঁকো মাঠ পথ
একদিন আধ দিন ভাঙাগড়া হ’তে-না-হ’তেই
চিহ্ন নেই- সে সব মানুষ কেউ নেই।
জীবনের ঢের কাজ হ’য়ে গেলে তবু
ভাঙনের নদী এসে সমাজের দুই পার ক্ষয়
ক’রে তার অন্ধকার সমুদ্রের দিকে
ভেসে চ’লে গেছে মনে হয়।
তবু গঠনের কাজে ফিরে এসে মানুষের মন
আগেকার গ্লানিমার যে নিস্ফালন
বার-বার শেষ ক’রে দিতে চায় তার
সূচনায় আলো তবু ভিতরে গভীর অন্ধকার?
অপ্রেম বেদনা রক্ত ভয়ে ভুলে বিলোড়িত হ’য়ে
রাত্রিদিন কাজ ক’রে চলেছে লোকের ইতিহাস;
মানুষ সমাজ দেশ ধ্বংস ক’রে তবু
জ্ঞান শান্তি বাস্তবতা প্রেমের আভাস
মাঝে-মাঝে পাওয়া যায় যেন তার বিদ্যুতের কাছে;
যদিও আঁধার বড়ো- ইতিহাসে শোকাবহ অন্ধ বেগ আছে;
সংকল্প প্রেরণা মূল্য উদাসীন শক্তির মতন
ভেঙে- নব-নব সূর্যে আলোকিত ক’রে তোলে মন।
[দেশ। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৩৬০]

জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমানে বাংলাদেশ) অন্তর্গত বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন৷ তার পূর্বপুরুষগণ বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর(বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) পরগণার কুমারভোগ নামক স্থানে “গাওপারা” গ্রামের নিবাসী ছিলেন যা পদ্মায় বর্তমানে বিলীন হয়ে গেছে৷ স্থানটি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় অবস্থিত৷
তার পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৩৮-৮৫) বিক্রমপুর থেকে বরিশালে স্থানান্তরিত হন৷সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন৷ তিনি বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন এবং তার মানবহিতৈষী কাজের জন্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হন৷