পরস্পর কবিতা – জীবনানন্দ দাশ ( ধূসর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ, ১৯৩৬ )

পরস্পর কবিতা – কবিতাটি বাঙালি বিখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশ এর ” ধূসর পাণ্ডুলিপি ” ধূসর পাণ্ডুলিপি। এই কাব্যগ্রন্থটি জীবনানন্দ দাশের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থটি ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয়। কবি এই বইটি কবি বুদ্ধদেব বসুকে উৎসর্গ করেন। যে কাব্যগ্রন্থ গুলো দিয়ে বাংলা আধুনিক কবিতার যাত্রা শুরু তার মধ্যে ধূসর পান্ডুলিপি অন্যতম বলে অনেকে মনে করেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালকের কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব ছিলো লক্ষ্যণীয়।

 

পরস্পর কবিতা

পরস্পর কবিতা - জীবনানন্দ দাশ ( ধূসর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ, ১৯৩৬ )

 

কবিতা:পরস্পর কবিতা
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: ধূসর পাণ্ডুলিপি

 

 

 

মনে প’ড়ে গেল এক রূপকথা ঢের আগেকার ,

কহিলাম,- শোনো তবে ,-

শুনিতে লাগিল সবে,

শুনিল কুমার ;

কহিলাম ,- দেখেছি সে চোখ বুজে আছে,

ঘুমানো সে এক মেয়ে – নিঃসাড় পুরীতে এক পাহাড়ের কাছে ;

সেইখানে আর নাই কেহ ,-

এক ঘরে পালঙ্কের’পরে শুধু এক খানা দেহ

প’ড়ে আছে ;- পৃথিবীর পথে- পথে রূপ খুঁজে খুঁজে

তারপর,- তারে আমি দেখেছি গো ,- সেও চোখ বুজে

প’ড়েছিল;- মসৃণ হাতের মতো শাদা হাত দুটি

বুকের উপরে তার রয়েছিল উঠি !

আসিবে না গতি যেন কোনদিন তাহার দু’পায়ে

পাথরের মতো শাদা গায়ে

এর যেন কোনোদিন ছিল না হৃদয় ,-

কিংবা ছিল – আমার জন্য তা নয় !

আমি গিয়ে তাই তারে পারিনি জাগাতে ,

পাষাণের মতো হাত পাষাণের হাতে

রয়েছে আড়ষ্ট হয়ে লেগে ;

তবুও,- হয়তো তবু উঠিবে সে জেগে

তুমি যদি হাত দুটি ধরো গিয়ে তার !-

ফুরালাম রূপকথা , শুনিল কুমার ।

তারপর, কহিল কুমার,

আমিও দেখেছি তারে,- বসন্তসেনার !

মতো সেইজন নয় ,- কিংবা হবে তাই ,-

ঘুমন্ত দেশের সে-ও বসন্তসেনাই !

মনে পড়ে ,- শোনো ,- মনে পড়ে

নবমী ঝরিয়া গেছে নদীর শিয়রে ,-

( পদ্মা – ভাগীরথী – মেঘ্না – কোন নদী যে সে –

সে সব জানি কি আমি !- হয়তো বা তোমাদের দেশে

সেই নদী আজ আর নাই ,-

আমি তবু তার পাড়ে আজো তো দাঁড়াই ! )

সেদিন তারার আলো – আর নিবু নিবু জ্যোৎস্নায়

পথ দেখে , যেইখানে নদী ভেসে যায়

কান দিয়ে তার শব্দ শুনে ,

দাঁড়ায়েছিলাম গিয়ে মাঘরাতে ,- কিংবা ফালগুনে ।

দেশ ছেড়ে শীত যায় চ’লে

সে সময় – প্রথম দখিনে এসে পড়িতেছে ব’লে

রাতারাতি ঘুম ফেঁসে যায়,

আমারো চোখের ঘুম খসেছিল হায়,-

বসন্তের দেশে

জীবনের – যৌবনের ;- আমি জেগে,- ঘুমন্ত শুয়ে সে !

জমানো ফেনার মতো দেখা গেল তারে

নদীর কিনারে !

হাতির দাঁতের গড়া মূর্তির মতন

শুয়ে আছে ,- শুয়ে আছে শাদা হাতে ধবধবে স্তন

রেখেছে সে ঢেকে !

বাকিটুকু ,-থাক – আহা , একজনের দেখে শুধু – দেখে না অনেকে

এই ছবি !

দিনের আলোয় তার মুছে যায় সবি ! –

আজো তবু খুঁজি

কোথায় ঘুমন্ত তুমি চোখ আছো বুজি !

 

কুমারের শেষ হলে পরে ,-

আর এক দেশের এক রূপকথা বলিল আর একজন ,

কহিল সে ,- উত্তর সাগরে

আর নাই কেউ !-

জ্যোৎস্না আর সাগরের ঢেউ

উঁচুনিচু পাথরের’পরে

হাতে হাত ধ’রে

সেইখানে ; কখন জেগেছে তারা – তারপর ঘুমাল কখন !

ফেনার মতন তারা ঠাণ্ডা – শাদা,-

আর তারা ঢেউয়ের মতন

জড়ায়ে জড়ায়ে যায় সাগরের জলে !

ঢেউয়ের মতন তারা ঢলে !

সেই জল মেয়েদের স্তন

ঠাণ্ডা, – শাদা, – বরফের কুঁচির মতন !

তাহাদের মুখ চোখ ভিজে ,-

ফেনার শেমিজে

তাহাদের শরীর পিছল !

কাচের গুঁড়ির মতো শিশিরের জল

চাঁদের বুকের থেকে ঝরে

উত্তর সাগরে !

পায়ে- চলা পথ ছেড়ে ভাসে তারা সাগরের গায়ে ,-

কাঁকরের রক্ত কই তাহাদের পায়ে !

রূপার মতন চুল তাহাদের ঝিকমিক করে

উত্তর সাগরে !

বরফের কুঁচির মতন

সেই জল- মেয়েদের স্তন !

মুখ বুক ভিজে,

ফেনার শেমিজে

শরীর পিছল !

কাচের গুঁড়ির মতো শিশিরের জল

চাঁদের বুকের থেকে ঝরে

উত্তর সাগরে !

উত্তর সাগরে !

 

সবাই থামিলে পরে মনে হল – একদিন আমি যাবো চ’লে

কল্পনার গল্প সব ব’লে

তারপর ,- শীত-হেমন্তের শেষে বসন্তের দিন

আবার তো এসে যাবে ;

এক কবি ,- তন্ময় , শৌখিন ,-

আবার তো জন্ম নেবে তোমাদের দেশে !

আমরা সাধিয়া গেছি যার কথা ,- পরীর মতন এক ঘুমোনো মেয়ে সে

হীরের ছুরির মতো গায়ে

আরো ধার লবে সে শানায়ে !

সেই দিনও তার কাছে হয়তো রবে না আর কেউ ,-

মেঘের মতন চুল ; তার সে চুলের ঢেউ

এমনি পড়িয়া রবে পালঙ্কের’পর ,-

ধূপের ধোঁয়ার মতো ধলা সেই পুরীর ভিতর !

চারপাশে তার

রাজ – যুবরাজ – জেতা – যোদ্ধাদের হাড়

গড়েছে পাহাড় !

এ রূপকথার এই রূপসীর ছবি

তুমিও দেখিবে এসে ,-

তুমিও দেখিবে এসে কবি !

পাথরের হাতে তার রাখিবে তো হাত ,-

শরীরে ননীর ছিরি ,- ছুঁয়ে দেখো – চোখা ছুরি ,- ধারালো হাতির দাঁত !

হাড়েরই কাঠামো শুধু ,- তার মাঝে কোনোদিন হৃদয় মমতা

ছিল কই ! – তবু , সে কি জেগে যাবে ? কবে সে কি কথা

তোমার রক্তের তাপ পেয়ে ?-

আমার কথার এই মেয়ে ,-এই মেয়ে !

কে যেন উঠিল ব’লে,- তোমরা তো বলো রূপকথা,-

তেপান্তরের গল্প সব ,- ওর কিছু আছে নিশ্চয়তা !

হয়তো অমনি হবে,- দেখিনিকো তাহা ;

কিন্তু , শোনো –স্বপ্ন নয় , আমাদেরি দেশে কবে আহা !-

যেখানে মায়াবী নাই ,- জাদু নাই কোনো ,-

এ দেশের- গাল নয়, গল্প নয় , দু’একটা শাদা কথা শোনো !

সে-ও এক রোদে লাল দিন ,

রোদে লাল -, সবজীর গানে গানে সবুজ স্বাধীন

একদিন,- সেই একদিন !

ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল চোখে ,

ছেঁড়া করবীর মত মেঘের আলোকে

চেয়ে দেখি রূপসী কে প’ড়ে আছে খাটের উপরে !

মায়াবীর ঘরে

ঘুমন্ত কন্যার কথা শুনেছি অনেক আমি , দেখিলাম তবু চেয়ে চেয়ে

এ ঘুমোনো মেয়ে

পৃথিবীর ,- মানুষের দেশের মতন;

রূপ ঝ’রে যায় ,- তবু করে যারা সৌন্দর্যের মিছা আয়োজন ,-

যে যৌবন ছিঁড়েফেরে যায়,

যারা ভয় পায়

আয়নায় তার ছবি দেখে !-

শরীরের ঘুণ রাখে ঢেকে ,

ব্যর্থতা লুকায়ে রাখে বুকে,

দিন যাহাদের অসাধে ,- অসুখে !-

দেখিতেছিলাম সেই সুন্দরীর মুখ ,

চোখে ঠোঁটে অসুবিধা ,- ভিতরে অসুখ !

কে যেন নিতেছে তারে খেয়ে !-

এ ঘুমোনো মেয়ে

পৃথিবীর ,- ফোঁপরার মতো ক’রে এরে লয় শুষে

দেবতা গন্ধর্ব নাগ পশু ও মানুষে !…

সবাই উঠিল ব’লে ,- ঠিক –ঠিক –ঠিক !

আবার বলিল সেই সৌন্দর্য- তান্ত্রিক,-

আমায় বলেছে সে কি শোনো ,-

আর এক জন এই ,-

পরী নয় ,- মানুষ ও সে হয়নি এখনো ,-

বলেছে সে – কাল সাঁঝরাতে

আবার তোমার সাথে

দেখা হবে ? – আসিবে তো ?- তুমি আসিবে তো !

দেখা যদি পেত !

নিকটে বসায়ে

কালো খোঁপা ফেলিত খসায়ে ,-

কি কথা বলিতে গিয়ে থেমে যেত শেষে

ফিক ক’রে হেসে !

তবু , আরো কথা

বলিতে আসিত ,- তবু, সব প্রগলভতা

থেমে যেত !

খোঁপা বেঁধে ,- ফের খোঁপা ফেলিত খসায়ে,-

স’রে যেত , দেয়ালের গায়ে

রহিত দাঁড়ায়ে !

রাত ঢের , – বাড়িবে আরো কি

এই রাত!- বেড়ে যায় , তবু চোখাচোখি

হয় নাই দেখা

আমাদের দুজনার !- দুইজন ,- একা !-

বার-বার চোখ তবু কেন ওর ভ’রে আসে জলে !

কেন বা এমন ক’রে বলে,

কাল সাঁঝরাতে

আবার তোমার সাথে

দেখা হবে !- আসিবে তো?- তুমি আসিবে তো !-

আমি না কাঁদিতে কাঁদে , দেখা যদি পেত !…

দেখা দিয়ে বলিলাম , ‘ কে গো তুমি ?’- বলিল সে , ‘ তোমার বকুল ,

মনে আছে ?’- ‘ এগুলি কি , বাসি চাঁপাফুল ?

হ্যাঁ , হ্যাঁ , মনে আছে ;’ – ‘ভালোবাসো ?’ –হাসি পেল, – হাসি !

‘ ফুলগুলো বাসি নয় ,- আমি শুধু বাসি !’

আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছে ফেলে

নিবানো মাটির বাতি জ্বেলে

চ’লে এল কাছে ,-

জটার মতন খোঁপা অন্ধকারে খসিয়া গিয়াছে –

আজো এত চুল !

চেয়ে দেখি ,- দুটো হাত, ক’খানা আঙুল

একবার চুপে তুলে ধরি ;

চোখ দুটো চুন-চুন ,- মুখ খড়ি-খড়ি!

থুতনিতে হাত দিয়ে তবু চেয়ে দেখি ,-

সব বাসি ,সব বাসি , একেবারে মেকি !

 

১ thought on “পরস্পর কবিতা – জীবনানন্দ দাশ ( ধূসর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ, ১৯৩৬ )”

Leave a Comment