বেলুনের মতো আমি । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

বেলুনের মতো আমি কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ডে রচিত। যা ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

 

বেলুনের মতো আমি । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

বেলুনের মতো আমি

কবিতা: বেলুনের মতো আমি
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

 

বেলুনের মতো আমি । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

বেলুনের মতো আমি এক দিন উড়ে যাব বায়ুর স্তরের থেকে দূর বায়ুস্তরে
স্বপ্ন-বেলুনের মতো, আহা, যে আর আসে না ফিরে নিম্নে এই মৃত্তিকার ঘরে
যবে পেট গ্যাসের দুর্গন্ধ দিয়ে ভরা নয়- যার দেহ, যার গতি, যে এই গ্রহ-পার্থিব
কবে আমি হব এই পৃথিবীর শূকরের কলরোলে জিনের মতন সেই জীব
দু’ পাখা আকাশে মেলে,- টেলিস্কোপ তুলে জীনস যে-আকাশ কোনও- কোনও দিন
দেখে নাই- দেখিবে না- যে-অসমীচীনকে কভু চিনিবে না কোনও দিন কোনও সমীচীন

বিজ্ঞানের আলোড়নে- কবে সেই গণিতবিহীন স্নিগ্ধ আন্তর্নাক্ষত্রিকে
উড়িব চিলের মতো, হে পরি, তোমাকে নিয়ে দিক থেকে আরও দূর দিকে
যেখানে নক্ষত্র ম’রে অন্ধকার হয়ে যায়- আলোর কুয়াশা হয়ে ফুটে ওঠে ফের
উর্বশী রমণীর মুখখানা দেখা যায়- হেসে বলে মানুষের জ্ঞানের কর্মের
আর্তনাদ এখনও কি হয় নাই শেষ- সেই মশার মতন তুচ্ছ পৃথিবীর পেটে
ব’লে সে নীলাভ শুঁটিফুলগুলো অনুপম- ডান হাতে কাঁচি দিয়ে কেটে
আমার পালকে গুঁজে দেয়, আহা,- কোনও দিন পৃথিবীর কার্তিকের ঘাসে
সেই পক গন্ধ আমি পাই নাই- কোনও দিন জৈব স্নেহে চৈত্রের আকাশে
শুক্লা ত্রয়োদশী রাতে এই নীল শাটিনের তাম্বু আমি দেখি নাই চোখে
পৃথিবীর কবিদের পাণ্ডুলিপি যখন পড়েছি আমি রজনীতে মোমের আলোকে

দেখি নাই এই মেঘ-গম্বুজ নক্ষত্রের চোখ ঘেঁষে কান ছুঁয়ে লক্ষ মৃত চমরীর মতো
যেন সাদা-মতো- যেন শব্দহীন- নিশীথের প্রান্তরের মতো অব্যাহত
যেন কোনও বাইজেনটীয় সম্রাটের- ভ’রে আছে সাদা-সাদা যূথিকার ভারে
প্রাকারের চূড়া যেন শিহরিয়া ওঠে ভয়ে দিগন্তের ঝাউয়ের আঁধারে
যখন সে অকস্মাৎ দেখে ফেলে দানবীর মতো উঁচু স্ফটিক-মিনার

লক্ষ-লক্ষ যুগ ধ’রে দেখেছে সে- তবুও আবার দেখে কেঁদে উঠিবার
প্রগাঢ় গুমোট যেন- কানের পটহহীন যেন মুখচ্ছবির ভিতরে
আঁখির শফরী দু’টি কোনও দূর ছন্দস্মিত পাথরের প্রতিমার তরে
গিয়েছে পাথর হয়ে; আমার হৃদয়ে তবু জেগে ওঠে এক অকুতোভয়তা
সেই খানে ভূমি পায় চির-দিন রূপ আর প্রণয়ের কথা
গবেষণাগারে ব’সে পৃথিবীর বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীরা যেই বিভীষিকা

রচনা করিতে আছে- পৃথিবীর মাছিরা তা খেয়ে ফেলে- ভেজাল মধুর স্বাদে সে-সব মক্ষিকা
ঝ’রে পড়ে;- এইখানে মনীষার গালে কোনও গর্ত নাই- কপালের বিবর্ণ পিত্তলে
ক্লিষ্ট হলরেখা নাই;- এই নিচে মাটি এসে কানে-কানে বলে:
সুন্দরীরে লজ্জা দিতে চাই আমি- ব্যথা দিতে- তাই তার গালে
মাংসল গলগণ্ড ঝুলায়ে-ঝুলায়ে আমি তৃপ্ত করি মনের তামাশা

পৃথিবীর দার্শনিক অচিন্ত্যের ধ্যানে থেকে কখনও কি করেছিল আশা
দাঁতের মাড়িতে তার পুঁজ এসে জ’মে র’বে… স্বপ্নে আমি দেখি নি কি মাদ্রিদের বইয়ের দোকানে
কী যেন খুঁজিতে গেছি- হয়তো-বা ভুল টুপি ছেঁড়া জুতো- অশিক্ষিত মস্তিষ্কের ব্যথা
বুঝিতে গিয়েছি আমি বইয়ের দোকানে ঢুকে লম্বা এক চঙ্গে চ’ড়ে-চ’ড়ে
কয়েকটি বই পেড়ে দেখিতে চেয়েছি আমি কী ক’রে জীবন-ঘড়ি ঘোরে
পৃথিবীর ঋষিদের;- সহসা আঁধার সব হয়ে গেল বৈমানিক আলো

চঙ্গের উপরে আমি একা ব’সে- ভাঙা এক উঁচু এক দেয়ালের কোণে
বইয়ের দোকান যেন- ভূতুড়ে বাঘের মতো কুয়াশার কোনও উলুবনে
উড়ে গেছে- নাক-কান-কাটা মেষপালকের মতো ত্রিভঙ্গ দেয়াল
প’ড়ে আছে;- ভৌতিক বায়ু, হায়, তার ভেড়া-ছাগলের পাল
দুপুরের রৌদ্রে যেন মিশে গেছে- আমারে চকিত দেখে চমকিত চঙ্গ বলে
কোথায় পালাবে তুমি মননের বিগ্রহেরে একা ফেলে- বন্ধু, বোসো-বোসো
আকাশে মাথার ‘পরে এরোপ্লেন-শকুনেরা উড়িতেছে সোঁ-সোঁ

তাই আমি বিচিন্তার উচ্ছিষ্টেরে পিছে ফেলে ছুটিলাম
দেখিলাম সোনার বিকেলে রৌদ্রে মাছি উড়িতেছে মাঠে- বিস্ফোরক আছে
তাদেরও জগতে জেনো- রেশমি পাতার ঘন বুনুনিতে-ভরা এক পেয়ারার গাছে
সুগন্ধ ফলের ভিড় প্রেম হয়ে আছে, তবু মনে হল- কোনও এক গলির কিনারে
শান্তি হয়ে আছে যেন- এক স্তূপ মৃত ছেলেমেয়ে শুধু তাহাদের মাংসের ভারে
না পারে উড়িতে স্বর্গে- না পারে নামিতে নিচে নরকের জলে

স্বর্ণাভ রৌদ্রের রেণু বিষাক্ত করিতে তারা রয়ে গেল এই তরু-তনিমার তলে
সদ্যমৃত এরা আজ- খানিকটা রৌদ্র, ঘাস, লোনা, ফুল, মক্ষিকার ঘ্রাণ
এখনও এদের দেহে লেগে আছে- রূপবান রূপবতী অনেক সন্তান
যদি কোনও মায়াবীরে ডাক দেই- মনে হয় যেন তার মায়াদণ্ড ঘিরে
বোর্নিও’র প্রজাপতিদের মতো এরা উড়িবে ব্যাকুল চিত্তে- বিচিত্র সমীরে

হয়তো-বা একটোপ্লাজমের দেহে জাফরান পাখি হয়ে (এত ক্ষণে) ইহারা সকলে
রুপালি কাকলি তুলে উড়িতেছে ফ্রাঙ্কো’র অজানিত কোনও এক নির্ভাবনা বলে
হয়তো-বা- হয়তো-বা- তাই আমি স্বপ্ন-বেলুনের কথা ভাবি রাতদিন
যে-অসমীচীনকে কভু চিনিবে না দু’এ-দু’এ-চার-রপ্ত কোনও সমীচীন
কোথায় সে-বেলুন রয়েছে ভেবে- পরিত্যক্ত রাস্তার কোনও এক দরজির ঘরে
ঢুকিলাম;- অনেক চামচ কাটা চিনেবাসনের ভিড়- হঠাৎ মানুষ দেখে মেঝের উপরে
স্থাণু হয়ে ম’রে গেল;- চারি-দিকে আরশোলা- কৃকলাস- মাকড়ের জাল

পত্নী আর সন্তানেরা ম’রে গেছে ব’লে কেউ বসায় না- বাহিরে সন্ধ্যার ঘোরে নিভিছে বিকাল
দরজিটা জামা ছাঁটে- কচ্ কচ্ করে কাঁচি- মুখে এক ঘুসি মেরে তার
নিলাম ছিনায়ে তার সাইকেল- হো-হো হেসে যেই কাঁচি ধরিল আবার
বোমা’র গর্জনে সব অন্ধকার হয়ে গেল- দরজিরে আলিঙ্গিল এসে তার সতী
মাটির চীবর যেন মুহূর্তেই পেয়ে গেল স্বর্গের রেশমে সদগতি

এরোপ্লেন- বিস্ফোরক- আমারে মারে না কেন?- সাইকেল হাতে নিয়ে ঘুরে
দাঁড়াতে-না-দাঁড়াতেই দরজিটা আর নেই- সাপের ভেল্কি সব- আমি কি সাপুড়ে!
আমি যদি হারিকিরি ক’রে ফেলি আধ্যাত্মিক আলোড়নে জাপানির মতো
হে মৃত্যু, তখন তুমি পাশ কেটে চ’লে যাবে কী ক’রে, বল তো?
হাঁসের মতন গলা ভাসায়ে বাতাসে তবু বলিল আমার শার্ট- কেন অপচয়
সময়ের অপচয় করো তুমি? মরণে তোমার নাই, আমার আছে তো তবু ভয়
মৃত মানুষের গায়ে লিনেনের জামা হয়ে হিম হয়ে প’ড়ে থাকিবার
প্রয়োজন, হে বিধাতা, কখনও করে না যেন আমার আত্মারে অধিকার

 

বেলুনের মতো আমি । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

বলিল খাকি’র শার্ট- অথবা হয়তো শার্ট বাংলা’র: সুপুরি-বনের পাশে নদীর দেশের
অরুণ রঙের যেন ছাতি আর আস্তিন- অথবা ধূসর রং চিলের মেষের
গভীর রহস্য এক জন্ম নিল আমার হৃদয়ে শুধু- ধবল হাঁসের মতো হয়ে
মৃত্যু নয়- স্বপ্নের ল্যাডার’এ যদি চড়ি আমি- সব বিফলতা যাবে মুহূর্তেই ক্ষ’য়ে
তন্বীর মতন এক রূপ পাবে মোর আত্মা- চারি-দিকে ভালো মেঘ- আকাশের ভ্রূকুটি- উদগার
কলসি মাথায় নিয়ে গরবা’র নৃত্যে আমি নূপুর বাজাব বার-বার

দূর নক্ষত্রের দিকে যেতে হবে;- ‘স্বপ্নের ল্যাডার কী রে?’- এ কথা শুধায়
পৃথিবীর কালা আর কানা আর বোবা আর খোঁড়া- যারা স্ফূর্ত জ্যোৎস্নায়
জনার-খেতের দিকে চেয়ে থাকে খানিকটা ভুট্টা পোড়ায়ে খাবে ব’লে
মূলার মতন যারা মৃত্তিকার পিণ্ডে ঢুকে খানিকটা মাংস আর গোঁফদাড়ি হলে
শেষ তৃপ্তি পেয়ে যায়- জেলের ভিতরে ঢুকে যারা হয় ছাগলের কম্বলের লোম
জেলের বাহিরে এসে গোঁফদাড়ি ফেলে দিয়ে হয়ে যায় সাধু শালগম

যারা কেউ-ই নয়- যারা কিছু নয়- যাদের কুড়ায়ে নিয়ে থালার ভিতর
স্যালাডের মতো ক’রে খেয়ে ফেলে আরকে ভিজায়ে নিয়ে পৃথিবীর যত সদাগর
তবু আমি সাইকেল ছুটাতেছি- এরোপ্লেনের নিচে- পৃথিবীর অন্ধকার রাজপথ দিয়া
ঝুড়ি-ঝুড়ি বোকা শালগম আমি তুলে নেব কল্পনার রুমালে বাঁধিয়া
আমার এ ধবল দ্বিরদ গতিরে কেউ কোনও মৃত্যু- কোনও হিংসা- সদাগর করিবে না হ্রাস

আমার আকাশে এক জ্যোৎস্না আছে- আমার হৃদয়ে আছে বাতাবিফুলের গন্ধ, মধুকূপী ঘাস
আমার ডাহিন হাতে দণ্ড আছে মায়াবীর মতো যেন- হয়ে যাবে অবিনাশী ধবল কপোত
পৃথিবীর সব মুলো পেঁয়াজ আর রসুনের বাঁদরেরা- যেই সব স্থল- আর জল-দস্যু-পোত
দুধ আর মধু খেয়ে রঙিন ফলাওয়ে পাল উড়াতেছে পৃথিবীর সাগরে-সাগরে
তাহারা জন্মিবে ফিরে নটী আর মিস্ত্রি মুচি মেথরের ঘরে

কল্পনারে পাবে ব’লে- তুষারের অন্ধকারে মেরুদামিনীর মতো জ্যোতির্ময় ধূম
দেখিতে পারিবে ব’লে- চিনে কুলিদের পিঠে খুঁটি গেড়ে হুঁশিয়ার বুদ্ধির ছিলুম
টানিবে না তারা আর- অনুভূতি পাবে ব’লে অবিকার রুধিরের ক্রেতা ও বিক্রেতা
পেঁচা আর ইঁদুরের খেলা ছেড়ে- শমনের মুখোমুখি যেন নচিকেতা

দাঁড়াবে পুলকে এসে- যত দূর চোখ যায় পক্ক রাত্রি- দারুচিনি-বনের বিস্তার
মজুরের মাংস ছিঁড়ে কাটলেট সে-দিন খাবে কি কোনও ভাঁড়
হয়তো খাবে না আর- সাইকেলে ছুটিতেছি পৃথিবীর রাজপথ দিয়া
শিশুরা দৈত্যের গল্প পড়িতেছে- হাড়হাভাতেরা সব যেতেছে হাঁকিয়া

নকল সোনা’র ঘড়ি: আসলের চেয়ে ভালো- চার আনা দু’ আনা শুধু দাম
হয়তো সে তোমারেই ভালোবাসে, বরাননে, তবু তুমি শুধালে না কী-বা তার নাম
তার পায়ে রুগ্ন ছাগলের মতো মিনমিনে ছেঁড়া মোজা দেখে
স্বর্ণ-গালিচায় উড়ে চ’লে যায়, নেমেছিল অনুরাধা নক্ষত্রের থেকে।

 

Leave a Comment