মনে হয় এ প্রভাত কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ডে রচিত। যা ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

মনে হয় এ প্রভাত
কবিতা: মনে হয় এ প্রভাত
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

মনে হয় এ-প্রভাত পৃথিবীর অই দূর দিকচক্রবাল যেন
অন্য কোনও লক্ষ্য নিয়ে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে-
আপনারে আশ্চর্য বিস্তারে স্থির, সৌম্য, অবারিত, অবিদিত রেখে
যেন অবিরাম নিরুদ্দেশ কোরেলের ধ্বনি
আমাদের প্রাণ, ইচ্ছা, চিন্তনীয়তাকে আমাদের হাতে রেখে
কোনও বয়ঃসন্ধিহীন তবু জরাহীন, আহা, অভাবনীয়ের দৌত্য করিতেছে
হেমন্তের গাছগুলো টের পায় যেন সব-
হাহাকারে এক-এক বার প্রতিবাদ ক’রে ওঠে
হলুদ পাতার সমারোহ তাহাদের উঠে আকাশকে আক্রমণ করে
ঝ’রে পড়ে- মৃত্তিকাকে নিরঙ্কুশ পচনের রস ব’লে জেনে
ঘুম মৃত্যু শান্তি ব’লে
ডোরাকাটা প্যান্ট প’রে যেন কোনও জীবনের সুস্থ বিদূষক
বিপুল তামাশা বোধ করেছিল মায়ের গর্ভের থেকে নেমে প’ড়ে
এই নীলিমার নিচে এসে- মদিরার মতো এই রৌদ্র পান ক’রে
দুধের ফেনার মতো বাতাসকে মক্ষিকা’র মতো ত্রস্ত মুখে মেখে
ইঁদুরের সুড়ঙ্গের অন্ধকার- প্লেগ- ভীরু আরাধনা- অবিশ্বাস- সহিষ্ণুতা
কাসুন্দি’র মতো যেন সবুজ শাকের ডিশে ঢেলে দিয়ে
অপরূপ ঘ্রাণে আর্ত হয়ে উঠে- হেসেছিল- ভালোবেসেছিল-
কোনও শ্বেত সমন্বয় চেয়েছিল রহস্যের বাঁকা ভুরু তুলে
তবু তার মৃত্তিকার বাজারের থেকে কেনা ছ’ আনা দামের নেকটাই ধ’রে হিঁচড়ায়ে
টেনে নিয়ে গেল সেই ভাঁড়টাকে পৃথিবীর হাট থেকে
যেন কোনও নিয়ামক অদৃশ্য রুটিন
কোনও এক সঙঘারামে- প্রশ্নহীন সুগম্ভীর অন্ধকারে ছেড়ে দিল
ভিক্ষুণীর মুখোশ পরায়ে তারে-

মুখে তার চা-খড়ির বিষণ্নতা- বিষণ্নতা- (এনে)
ঘোমটার অন্ধকারে নাক ঢেকে
দুই হাত দীর্ঘ এক প্রকোষ্ঠের অসীম সমুদ্রে
ভাসমান সে; পাশে তার নাবিকেরা অবিরল;- পরস্পর থেকে ছিন্ন
কোনও এক জীবন-সঙ্কুল, ভয়ঙ্কর কৌতূহলী মৃত যাত্রীদের
নিমজ্জিত জাহাজের শূন্যগর্ভ অসংখ্য মদের পিপা অন্ধকারে ভাসিতেছে যেন
সিন্ধুকে চেনে না তারা, নীলিমাকে দেখে না ক’
হাতে ঢের কাজ আছে তাহাদের; সমুদ্রের শান্ত বুকে
কর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গড়ায়ে-গড়ায়ে তবু
ঢেউয়ের ড্যাঙশ খেয়ে নেচে উঠে মূঢ়তায়
সমীচীন প্রসঙ্গবিহীন পালকের যূথচারী ছাগলের মতো
পরস্পর শিং ঠুসে- যোনি ঘ’ষে-ঘ’ষে
মরিবার আগে
অন্তরঙ্গ তামাশার শেষ অভিনয়
জাঁকায়ে রাখিছে তারা লক্ষ স্মিত দার্শনিক নক্ষত্রের তরে।