বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি অক্ষয়কুমার বড়াল তাঁর সূক্ষ্ম প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, অনুভূতিপূর্ণ ভাষা ও কাব্যিক গুণের জন্য বিখ্যাত। তাঁর লেখা “শ্রাবণে” একটি চিত্রময় প্রকৃতিনির্ভর কবিতা, যেখানে বর্ষাকালের সৌন্দর্য, আবেগ এবং মনের স্পন্দন একত্রে মূর্ত হয়ে উঠেছে।
“শ্রাবণে” কবিতায় কবি বাংলার শ্রাবণ মাসের বৃষ্টিভেজা প্রকৃতিকে তুলে ধরেছেন অপূর্ব ভাষায়। কবিতাটিতে মেঘলা আকাশ, অবিরাম বৃষ্টি, জলভরা পথঘাট, নৌকা, কাদামাটি, মাঠঘাট সব কিছু মিলিয়ে শ্রাবণমাসের এক জীবন্ত ছবি আঁকা হয়েছে। কবির অনুভবে শ্রাবণের বৃষ্টি শুধু প্রকৃতির নয়, বরং মানুষের মনেও এক ধরনের আবেগ, স্মৃতি ও কল্পনার সঞ্চার ঘটায়।
কবিতার ভাষা সহজ, স্নিগ্ধ, এবং চিত্রধর্মী। প্রকৃতিকে অবলোকনের মধ্যে দিয়েই কবি মানবমন ও প্রকৃতির অন্তর্গত যোগসূত্র রচনা করেন। এতে রয়েছে ধীর-স্থির গতি, ছন্দময়তা এবং গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্র।
অক্ষয়কুমার বড়াল (১৮৬০–১৯১৯) বাংলা কাব্য সাহিত্যে “মৃদু রোমান্টিক” ধারার একজন কবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যিক আধিপত্যের যুগে তিনি নিজের স্বকীয় কণ্ঠ বজায় রেখে প্রকৃতি, প্রেম এবং গ্রামীণ জীবনকে কেন্দ্র করে কবিতা রচনা করতেন। তিনি নিসর্গের সঙ্গে মানুষের মনের গভীর সম্পর্ক তুলে ধরতে পারদর্শী ছিলেন।

শ্রাবণে কবিতা – অক্ষয়কুমার বড়াল

সারা দিন একখানি জল-ভরা শ্রান্ত মেঘ
রহিয়াছে ঢাকিয়া আকাশ ;
বসিয়া গবাক্ষ-ধারে সারা দিন আছি চেয়ে,
জীবনের আর্জি অবকাশ!
গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ে, তরুগুলি হেলে দোলে,
ফুলগুলি পড়িছে খসিয়া ;
লতাদের মাথাগুলি মাটিতে পড়িছে ঝুলি,
পাখীগুলি ভিজিছে বসিয়া।
কোথা সাড়া শব্দ নাই, পথে লোক জন নাই,
হেথা হোথা দাঁড়ায়েছে জল ;
ভিজে ঘাসবন হ’তে ফড়িং লাফায়ে ওঠে,
জলায় ডাকিছে ভেকদল।
চাতক, ঝাড়িয়া পাখা, ডাকিয়া ফটিক জল,
বেড়াতেছে উড়িয়া আকাশে ;
কদম্ব-কেতকী-বাস কম্পিত বাতাসে ভাসে ;
ঢাকা ধরা শ্যাম কুশ কাশে ।
দীঘিটি গিয়াছে ভ’রে, সিঁড়িটি গিয়াছে ডুবে,
কাণায় কাণায় কাঁপে জল ;
বৃষ্টি-ঘায়—বায়ু-ঘায়ে পড়িতেছে নুয়ে নুয়ে
আধ-ফোটা কুমুদ কমল। তীর-নারিকেল-মূলে থল থল করে জল,
ডাহুক ডাহুকী কূলে ডাকে ;
শ্রেণী দিয়া মরালীরা ভাসিছে তুলিয়া গ্রীবা,
লুকাইছে কভু দাম ঝাঁকে।
পাড়ে পাড়ে চকা চকী ব’
সে আছে দুটি দুটি ;
বলাকা মেঘের কোলে ভাসে ;
ক্বচিৎ বা গ্রাম্য বধূ শূন্য কুম্ভ লয়ে কাঁখে,
তরুশ্রেণী-তল দিয়া আসে।
ক্বচিৎ অশ্বত্থ-তলে ভিজিছে একটি গাভী ;
টোকা মাথে যায় কোন চাষী ;
ক্বচিৎ মেঘের কোলে মুমূর্ষুর হাসি সম
চমকিছে বিজলীর হাসি।
মাঠে নবশ্যাম ক্ষেতে কচি ধান-গাছগুলি
মাথাগুলি জাগাইয়া আছে—
কোলেতে লুটিছে জল টল্ মল্ থ থল,
বুকে বায়ু ধর্ থর্ নাচে।
সুদূরে মাঠের শেষে জ’মে আছে অন্ধকার,
কোথা যেন হ’তেছে প্রলয়!
ঘরে বসে মুড়ি দিয়া গৃহস্থ স্ত্রী-পুত্ৰ সহ
কত দুর্যোগের কথা কয়।
চেয়ে আছি শূন্য পানে— কোন কাজ হাতে নাই,
কোন কাজে নাহি বসে মন ;
তন্দ্ৰা আছে. নিদ্ৰা নাই ; দেহ আছে মন নাই ;
ধরা যেন অস্ফুট স্বপন

আরও দেখুনঃ
১ thought on “শ্রাবণে কবিতা – অক্ষয়কুমার বড়াল”