সহসা হয়তো কোনও কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ৭ম খণ্ডে রচিত। যা ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

সহসা হয়তো কোনও
কবিতা: সহসা হয়তো কোনও
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

– সহসা হয়তো কোনও দ্বার খুলে যাবে
যদিও বিচার নিয়ে ক্রীড়া ক’রে জীবনের দু’ পহর
কেটে গেল প্রায়
ন্যায়তর্কশিরোমণি তবু খানিকটা ক্লান্ত হয়ে হাসে যেন
তিত্তিরাজগাছের ছায়ায়- মাঝে-মাঝে- চোখোচোখি দেখা হলে
– তোমার নিকটে তার বলিবার শেষ কথা গিয়েছে ফুরায়ে? জানি আমি
হঠাৎ গভীর রাতে জেগে উঠে যেন কোনও এক বিবেকনিবিড় গৃহস্বামী
দিবসের তর্কের আমোদে যেই চবুতরা রচেছিল- ভেঙে ফেলে
আত্মতিক্ততায় পায়রাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় চোখ বুজে- মহাশূন্যে
কিংবা শেয়ালের মুখে- কিংবা দিগন্তের জ্যোৎস্নায়
যেন এক অরুন্তুদ শকাব্দের মণিকা চৌধুরি
সেই পাখি চুরি ক’রে নিয়ে যায়- নিয়ে যায়
– এত রাতে তুমিও এখানে?
– তোমার পড়ার-ঘর থেকে নেমে আসিলাম
মাঝরাতে যেন মোম জ্বলিতে-জ্বলিতে নিভে গেল- মনে হল
সেই ধোঁয়া- কোমল অদ্ভুত ঘ্রাণে ঘুম ভেঙে গেল
বিচলিত হয়ে গেল মন
ফের মোম জ্বেলে আমি দেখিলাম
রয়্যাল সাইজের এক পাণ্ডুলিপি প’ড়ে আছে
কাদের জীবনী তুমি লিখিতেছ?
– পৃথিবীতে তাহাদের নাম কয়েকটা দিন ধ’রে সকলেই ঢের শোনে।
তবুও মৃত্যুর পর- তারা এত নিরুত্তর।
কী-ই-বা জবাব দেবে;- জীবিতেরা প্রশ্ন করে না যে!
– এই সব পিণ্ডকুয়াশার জীবনের কথা লিখে
তুমিও নাচাও কেন কলমকে জলমাকড়ের মতো?
জানো না সে-সব তুমি
ডাকিলেই মরণের হাড় থেকে কা’রা উঠে এসে
আজও বিদ্যাধরী ক্যানেলের ব্যবস্থা-আক্রান্ত র’বে সারা-দিন
জীবনের দীপ্তি তাহাদের চিরন্তন
টেবিলের কান ধ’রে- ফাইল নেড়ে
– তোমার আমার চেয়ে এরা ঢের বিপরীত
– সুদীর্ঘ দিবস এরা কাঁটার ভিতর থেকে
বঁইচি’র ফুল তুলে নিয়ে স্বাদ পেল
এক পাল কাকের মতন আকাশের লঘিমা পেয়েছে
অপরূপ- প্রাণবান হয়ে
পৃথিবীর থেকে চ’লে গেছে

– আমাদের এরা তবু নিয়ন্ত্রিত করে
আমাদের জীবনের হেমন্তসন্ধ্যার লেলিহান মেঘ না হলে- হয়তো-
পৃথিবীকে কেরোসিন-গুদামের মতো মনে ক’রে দগ্ধ ক’রে যেত
– না- না- তুমিই তো কত বার বলেছিলে
আমাদের হেমন্তসন্ধ্যার (কমলারঙের) মেঘ- আভা; অগ্নি নয়।
– আভার ভিতর থেকে ভয়ঙ্কর আগুনের জন্ম হয়
তাই আমি রাত জেগে
ভারতীয় মিনারের মায়াবীকে আপাতত কুয়াশায় বসায়ে রেখেছি
মিশরের পরিচিত একটি মমি’কে এই দুপুর-রাতের
নিরন্ন দেরাজ থেকে মাদ্রাজি নস্যের কৌটো- চমৎকার- তুলে দিয়ে
বিদায় দিয়েছি। সুগন্ধি জোব্বার ঘ্রাণ সেই স্মিত বিক্ষুব্ধের
এখনও টেবিলে লেগে আছে
তবু আমি ইহাদের হাত ছেড়ে দিয়ে
গত বিশ বছরের গাড়িভরা ফাইল জড়ো ক’রে নিয়ে এসে বসিলাম…
মানবিক আয়ু শুধু আমাদের- ফাইল কত লক্ষ-লক্ষ মাইল!
তাই আমি সব দন্ধ ক’রে সাড়ে তিন সের শুধু তুলে রেখে দিয়েছি ভাঁড়ারে
ভারতীয় মায়াবীর দড়ি- ইল্যুসিয় রহস্যের মায়া
প্রতিভার তর্কাতীত কল্পনার সময়হীনতা যেন মধ্যবয়সীর মতো হেসে
অন্ধকার মণিবন্ধে রেডিয়াম-ডায়ালের ঘড়ি
কোনও এক প্রেমিকার কাছ থেকে পুরস্কার পেল।