জটিল যাত্রাপথের মানচিত্রে কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ১৩তম খণ্ডে রচিত। যা ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

জটিল যাত্রাপথের মানচিত্রে
কবিতা: জটিল যাত্রাপথের মানচিত্রে
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

তার সেই অতীব জটিল যাত্রাপথের মানচিত্রে
প্রথমেই (দয়ালু) জলপরবশ সমুদ্র এসে সমস্ত আকাশরেখা অধিকার ক’রে রাখল
অন্ধকার জল, পাশে-পাশে বস্তুর মতো এক-একটি কালো পাহাড়
মানুষের চোখ তার নীরব হৃদয়ের নিয়মে
ধীরে-ধীরে যখন বশীভূত হয়ে আসে
সেই জলের ভিতরে পাহাড়ের শিঙ্ হুবহু প্রতিফলিত হয়ে আছে
(অনুভব করতে পারে)
অনেক ক্ষণ ধ’রে তাকিয়ে দেখতে পারে
এই নির্দেশ কেউ নিজের জ্ঞাতসারে ছিঁড়ে ফেলতে পারে না
সহসা চোখ চেয়ে দেখে বালির উপরে অনেক কালো পাথর
ঈষৎ রোদের ভিতরে যে যার জায়গায় স্থির হয়ে (দাঁড়িয়ে) আছে
যা মানুষের চোখের দেখা তাদের কাছে হেঁয়ালির মতো
(তাদের অপর কোনও দোষ নেই)
নচেৎ তারা পাথর নয়।
হেমন্তের ঈষৎ রোদে পাহাড়
বস্তুর মতন দেখায় আর এক বার
একটি মহৎ গাধা যদি প্লেটোর আত্মা পেত
অথবা প্লেটো মহনীয় উটের আকার।
মানুষের চোখের রেখা তাদের কাছে হেঁয়ালির মতো
(তাদের অপর কোনও দোষ নেই)
স্যার আর্চিবল্ড সিনক্লেয়ার,
রিবেনট্রপ, মহাত্মা গান্ধি, মনোমোহন দে সরকার
নিজেদের পাথর, সমুদ্র, পাহাড় দেখে নিয়ে
নিয়তই নিজেদের বিষয়ান্তরের অন্তর্গত;
নিসর্গ তবুও (একান্তই) নিজের বিষয়ের মতন।

জীবনানন্দ দাশ ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাঙালি কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক৷ তিনি বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অন্যতম৷ তার কবিতায় পরাবাস্তবের দেখা মিলে৷ জীবনানন্দের প্রথম কাব্যে নজরুল ইসলামের প্রভাব থাকলেও দ্বিতীয় কাব্য থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন মৌলিক ও ভিন্ন পথের অনুসন্ধানী।
মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে তিনি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন এবং ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে যখন তার জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছিল, ততদিনে তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবিতে পরিণত হয়েছেন ৷ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গ ও রূপকথা-পুরাণের জগৎ জীবনানন্দের কাব্যে হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময়, তাতে তিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ অভিধায় খ্যাত হয়েছেন৷