ইলশেগুঁড়ির বৃষ্টি কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ১৪তম খণ্ডে রচিত। যা ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

ইলশেগুঁড়ির বৃষ্টি
কবিতা: ইলশেগুঁড়ির বৃষ্টি
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

ইলশেগুঁড়ির বৃষ্টি ঝ’রে যায় দুপুরবেলায়
দু’ মুঠো সন্তপ্ত রৌদ্রে তবুও নগরী
এখন উজ্জ্বল ট্রাম মোটরের গায়ে
মানুষের সময়ের ঘড়ি
হেঁকে বলে সাধারণ সুবিধায়
প্রেমের মানুষ চাপা প’ড়ে যায়
মানুষের ভিড়ে
মেঘের আড়ালে সূর্য, তবু তার প্রতিভা রয়েছে
হয়তো এখুনি দেখা দেবে সশরীরে।
সূর্যকে ও-রকম ভাবে তবু দেখে ফেলি যদি
সে যেন কেমন এক পাপ।
চারি-দিকে প্রাসাদের গম্বুজ রয়েছে
আগাগোড়া রয়েছে হুবহু ঢের ধাপ
(তবুও দুপুরে ঘণ্টা বেজে গেলে নগরীর রোদে)
নগরীর তিন চার মাইল, মাইল, অন্ধকার মেঘে;-
ছিঁচকে ছুঁড়ির মতো আর্তিও করুণ, ক্রমে দানবীয় হয়
বিশৃঙ্খল জ্যামিতির মতন উদ্বেগে
নগরীর রাজপথ কাটাকুটি ক’রে
আয়ুর সকালবেলা যেই সব স্মরণীয় বৃহৎ নগরে
চুলে চিরুনির সুর শুনেছি বিভোর হয়ে আমি
সেই মেয়েটির রমণীয় বেণি চৌ-পহর একাগ্রতা নষ্ট ক’রে
অনেক অন্যায় পথ পরস্পরের সাথে মিশে
অনেক সরল পথ অতীব জটিল হয়ে গিয়ে
অনেক সহজ জ্ঞান বাক্যের ভাঁওতায় প’ড়ে
(নামধেয় বিজ্ঞানের আঁধারে হারিয়ে)
বিজ্ঞানের ব্যয়কুণ্ঠতার মুখে ম’রে গিয়ে
চোখের সুমুখে ক্লান্ত নগরীর উঁচু-নিচু দেয়ালের সীমা
মিশে গেছে- আধো-মিশে গিয়েছে বাতাসে
নিজেদের মলিন দীর্ঘতা ছাড়া মানুষের হৃদয়কে কিছু
দেখাতে পারে না অনায়াসে
সময়ের অন্তিম সীমায় গিয়ে তারা
পৃথিবীর সব-শেষ নগরীর পিছে
তোমাকে বিকেলবেলা খুঁজে পাবে। স্বভাবসকাল
হারায়েছে ব’লে আজ তার সেই সরলতা মিছে।

জীবনানন্দ দাশ ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাঙালি কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক৷ তিনি বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অন্যতম৷ তার কবিতায় পরাবাস্তবের দেখা মিলে৷ জীবনানন্দের প্রথম কাব্যে নজরুল ইসলামের প্রভাব থাকলেও দ্বিতীয় কাব্য থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন মৌলিক ও ভিন্ন পথের অনুসন্ধানী।
মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে তিনি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন এবং ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে যখন তার জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছিল, ততদিনে তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবিতে পরিণত হয়েছেন ৷ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গ ও রূপকথা-পুরাণের জগৎ জীবনানন্দের কাব্যে হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময়, তাতে তিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ অভিধায় খ্যাত হয়েছেন৷