সবারই হাতের কাজ । জীবনানন্দ দাশ । মনবিহঙ্গম কাব্যগ্রন্থ,১৯৭৯

সবারই হাতের কাজ কবিতাটি মনবিহঙ্গম কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। এই কাব্যগ্রন্থ টি কবি জীবনানন্দ দাশের রচিত কাব্যগ্রন্থ । যা কবির মৃত্যুর অনেক বছর পর ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয়। এ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের বহু আগে ১৯৫৪-এর ২২ অক্টোবর এক ট্র্যাম দুর্ঘটনায় আহত হয়ে জীবনানন্দ লোকান্তরিত হয়েছিলেন। এই কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ৩৮ টি কবিতা স্থান পেয়েছে।

 

সবারই হাতের কাজ । জীবনানন্দ দাশ । মনবিহঙ্গম কাব্যগ্রন্থ,১৯৭৯

 

সবারই হাতের কাজ

কবিতা: সবারই হাতের কাজ
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

 

সবারই হাতের কাজ । জীবনানন্দ দাশ । মনবিহঙ্গম কাব্যগ্রন্থ,১৯৭৯

 

সবারই হাতের কাজ শেষ ক’রে নিতে হবে পৃথিবীতে আজ।
তাদের ভিতরে তবু (মুষ্টিমেয়) কেউ-কেউ ভালো ক’রে-ক’রে;
তাদের রুধিরে আছে জীবনের সম্পূর্ণ গরজ
সবই অভিনয় জেনে- বিখ্যাত মঞ্চের ‘পরে (তবুও তো) চড়ে।
ভালো ক’রে প’রে নেয় অবিকল কালো পরিধান;
সেখানে ক্কচিৎ প্রেম সততা মহত্ত্ব আছে অগণন দালালের বুকে
যেখানে ক্কাথের দিকে চেয়ে ভাঁড় ব’লে যায় ‘অনোরণীয়ান’
দার্শনিক গাধা ব’লে ফেঁসে যায় দু-এক চাবুকে,

সেখানে তবুও তারা চাঁই সাজে, মন্ত্রী হয়- মুদ্রারাক্ষস
কিংবা শ্লীল প্রেমিকের খেলা খেলে দগ্ধ করে চাঁদনীর চক;
কানে ধ’রে টেনে এনে ইহাদের মাথার তাড়স
বার ক’রে দিতে চায় অতি সন্দিহান বিদূষক;
তবুও বিয়োগনাট্যে প্রদীপ্তির কাজ করে যারা
টেবিলে ভাঁড়ের সাথে কাসুন্দিতে প্রায়শই পেয়েছে আমেজ,
তবু জানে নিজেদের পরিধানে গুরুতর বিষয়ের জামা,
ভাঁড়ের ধুতির ভাঁজে লুকায়ে রয়েছে শুধু লেজ।

এই পরিপূর্ণ জ্ঞানে বোঝে তারা তাহাদেরও মেরুদণ্ড বেয়ে
ব্যাঙাচির মতো কিছু সততই ন’ড়ে যায় ধীরে;
এ না হ’লে অনিরুদ্ধ, কৌটিল্য ও কর্ণ, দেবযানী
ভূত হ’য়ে মিশে যেত কোন্ কালে নাট্যের তিমিরে
এখনো অঙ্গার থেকে জন্ম নেয় এই সব বীজ;
চেয়ে দ্যাখে ঊর্ধ্বে মেঘ- সম্মুখেতে সিংহ মেঘ ষাঁড়
পায়ের ভঙ্গির নীচে কৰ্কট বৃশ্চিক
পাদপ্রদীপের আলো কেবলই খেতেছে অন্ধকার।

নাট্যের লিখন তারা- তবু তারা পড়েছিলো মৃগশিরা নক্ষত্রের নীচে,
কথোপকথন গান স্বগতোক্তি নেপথ্যের রব
শিশিরবিন্দুর মতো শব্দ করে দর্শকের কানে;
গ্যালারিতে মৃগীরোগাতুর নীল মহিলারা সব
কলরব ক’রে ওঠে ভয়ংকর করতালি দিয়ে
চামুণ্ডার মতো নেচে ছিঁড়ে ফেলে চুল
মাথার উপরে সব অগণন ভূতযোনি দেখে
তারা আর তাহাদের প্রণয়ীরা নাচায় লাঙ্গুল;
অতএব যবনিকা মাঝপথে নেমে পড়ে বটে
ম্লান হ’য়ে নিভে আসে পাদপ্রদীপের গোল আলো,
তবুও মঞ্চের ‘পরে অনিরুদ্ধ দেবযানী কচ
নিজেদের ভাষা ভেঙে একটুও হয় না দাঁতালো।

[ময়ুখ। অগ্রহায়ণ ১৩৬৫]

 

সবারই হাতের কাজ । জীবনানন্দ দাশ । মনবিহঙ্গম কাব্যগ্রন্থ,১৯৭৯

 

জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমানে বাংলাদেশ) অন্তর্গত বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন৷ তার পূর্বপুরুষগণ বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর(বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) পরগণার কুমারভোগ নামক স্থানে “গাওপারা” গ্রামের নিবাসী ছিলেন যা পদ্মায় বর্তমানে বিলীন হয়ে গেছে৷ স্থানটি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় অবস্থিত৷

তার পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৩৮-৮৫) বিক্রমপুর থেকে বরিশালে স্থানান্তরিত হন৷সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন৷ তিনি বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন এবং তার মানবহিতৈষী কাজের জন্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হন৷

Leave a Comment