জীবন মরণ দুয়ারে আমার-জীবনানন্দ দাশ ( ঝরা পালক কাব্যগ্রন্থ, ১৯২৭)

জীবন মরণ দুয়ারে আমার-কবিতাটি বাঙালি বিখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশ এর “ঝরা পালক” কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা। এই কাব্যগ্রন্থটি কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ যা ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়। তিনি সে সময় কলকাতার সিটি কলেজে টিউটরের চাকরি করতেন। প্রকাশক হিসেবে লেখা ছিল: শ্রীসুধীরচন্দ্র সরকার, ৯০/২/এ হ্যারিসন রোড, কলিকাতা। গ্রন্থটি ছেপেছিলেন এ. চৌধুরী ফিনিক্স প্রিন্টিং ওয়ার্কস, ২৩ নং কালিদাস সিংহ লেন, কলিকাতা। প্রচ্ছদে পাখির আটিটি পালকের ছবি দেয়া ছিল। ক্রাউন সাইজে পাতার সংখ্যা ছিল ৮ + ৯৩। মূল্য রাখা হয়েছিল এক টাকা। উৎসর্গ পত্রে লেখা ছিল: “উৎসর্গ- কল্যাণীয়াসু”; কারো নাম লেখা ছিল না।

 

জীবন মরণ দুয়ারে আমার

জীবন মরণ দুয়ারে আমার-জীবনানন্দ দাশ ( ঝরা পালক কাব্যগ্রন্থ, ১৯২৭)

 

কবিতা:জীবন মরণ দুয়ারে আমার
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: ঝরা পালক

 

 

সরাইখানার গোলমাল আসে কানে,

ঘরের শার্শি বাজে তাহাদের গানে,

              পর্দা যে উড়ে যায়

তাদের হাসির ঝড়ের আঘাতে হায়!

-মদের পাত্র গিয়েছে কবে যে ভেঙে!

             আজো মন ওঠে রেঙে

দিলদারদের দরাজ গলায় রবে,

             সরায়ের উৎসবে!

কোন্‌ কিশোরীর চুড়ির মতন হায়

পেয়ালা তাদের থেকে থেকে বেজে যায়

               বেহুঁশ হাওয়ার বুকে!

সারা জনমের শুষে-নেওয়া খুন নেচে ওঠে মোর মুখে!

                পান্ডুর দু’টি ঠোঁটে

ডালিমফুলের রক্তিম আভা চকিতে আবার ফোটে!

                মনের ফলকে জ্বলিছে তাদের হাসি ভরা লাল গাল,

ভুলে গেছে তারা এই জীবনের যত কিছু জঞ্জাল!

                আখেরের ভয় ভুলে

                দিলওয়ার প্রাণ খুলে

জীবন-রবাবে টানিছে ক্ষিপ্ত ছড়ি!

অদূরে আকাশে মধুমালতীর পাপড়ি পড়িছে ঝরি,-

                 নিভিছে দিনের আলো,

-জীবন- মরণ দুয়ারে আমার, কারে যে বাসিব ভালো

                 একা একা তাই ভাবিয়া মরিছে মন!

পূর্ণ হয় নি পিপাসী প্রাণের একটি আকিঞ্চন,

                  খুলেনি একটি দল,-

যৌবন- শতদলে মোর হায় ফোটে নাই পরিমল!

                   উৎসবলোভী অলি

                   আসে নি হেথায়,-

কীটের আঘাতে শুকায়ে গিয়েছে কবে কামনার কলি!

                    -সারাটি জীবন বাতায়নখানি খুলে

তাকায়ে দেখেছি নগরী-মরুতে ক্যারাভেন্‌ যায় দুলে

                    আশা-নিরাশার বালু-পারাবার বেয়ে,

সুদূর মরুদ্যানের পানেতে চেয়ে!

               সুখ-দুঃখের দোদুল ঢেউঢের তালে

নেচেছে তাহারা,- মায়াবীর জাদুজালে

মাতিয়া গিয়েছে খেয়ালী মেজাজ খুলি,

মৃগতৃষ্ণার মদের নেশায় ভুলি!

             মস্তানা সেজে ভেঙে গেছ ঘর-দোর,

লোহার শিকের আড়ালে জীবন লুটায়ে কেঁদেছে মোর!

কারার ধুলায় লুন্ঠিত হ’য়ে বান্দার মতো হায়

কেঁদেছে বুকের বেদুঈন মোর দুরাশার পিপাসায়!

             জীবনপথের তাতার দস্যুগুলি

হুল্লোড় তুলি উড়ায়ে গিয়েছে ধূলি

            মোর গবাক্ষে কবে!

কন্ঠ-বাজের আওয়াজ তাদের বেজেছে স্তব্ধ নভে!

           আতুর নিদ্রা চকিতে গিয়েছে ভেঙে,

সারাটি নিশীথ খুন- রোশনাই প্রদীপে মনটি রেঙে

           একাকী রয়েছি বসি,

নিরালা গগনে কখন নিভেছে শশী

          পাই নি যে তাহা টের!

-দূর দিগন্তে- চ’লে গেছে কোথা খুশরোজী মুসাফের!

          কোন্‌ সুদূরের তুরাণী প্রিয়ার তরে,

          বুকের ডাকাত আজিও আমার জিঞ্জিরে কেঁদে মরে!

দীর্ঘ দিবস ব’য়ে গেছে যারা হাসি-অশ্রুর বোঝা

          চাঁদের আলোকে ভেঙেছে তাদের ‘রোজা’;

আমার গগনে ‘ঈদরাত’ কভু দেয় নি হায় দেখা,

               পরানে কখনও জাগে নি ‘রোজা’র ঠেকা!

               কী যে মিঠা এই সুখের দুখের ফেনিল জীবনখানা!

এই যে নিষেধ, এই যে বিধান,-আইন-কানুন, এই যে শাসন মানা,

                ঘরদোর- ভাঙা তুমুল প্রলয়ধ্বনি

                নিত্য গগনে এই যে উঠিছে রণি

                যুবানবীনের নটনর্তন তালে,

                ভাঙনের গান এই যে বাজিছে দেশে দেশে কালে কালে,

এই যে তৃষ্ণা-দৈন্য-দুরাশা-জয়-সংগ্রাম-ভুল

               সফেন সুরার ঝাঁঝের মতন ক’রে দেয় মজ্‌গুল

                      দিওয়ানা প্রাণের নেশা!

ভগবান,- ভগবান,- তুমি যুগ যুগ থেকে ধরেছ শুঁড়ির পেশা!

-লাখো জীবনের শূণ্য পেয়ালা ভরি দিয়া বারবার

                 জীবন-পান্থশালার দেয়ালে তুলিতেছে ঝঙ্কার,-

                 মাতালের চিৎকার !

                 অনাদি কালের থেকে;

মরণশিয়রে মাথা পেতে তার দস্তুর যাই দেখে!

                  হেরিলাম দূরে বালুকার পরে রূপার তাবিজ প্রায়

জীবনের নদী কলরোলে ব’য়ে যায়!

                  কোটি শুঁড় দিয়ে দুখের মরুভূ নিতেছে তাহারে শুষে,

ছলা-মরীচিকা জ্বলিতেছে তার প্রাণের খেয়াল-খুশে!

মরণ-সাহারা আসি

                 নিতে চায় তারে গ্রাসি।-

তবু সে হয় না হারা

            ব্যথার রুধির-ধারা

জীবন-মদের পাত্র জুড়িয়া তার

            যুগ যুগ ধরি অপরূপ সুরা গড়িছে মশালাদার!

আরও দেখুন:

১ thought on “জীবন মরণ দুয়ারে আমার-জীবনানন্দ দাশ ( ঝরা পালক কাব্যগ্রন্থ, ১৯২৭)”

Leave a Comment