নদীটির স্বাদ পেয়ে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

নদীটির স্বাদ পেয়ে কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ৫ম খণ্ডে রচিত। যা ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

 

নদীটির স্বাদ পেয়ে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

নদীটির স্বাদ পেয়ে

কবিতা: নদীটির স্বাদ পেয়ে
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

 

নদীটির স্বাদ পেয়ে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

নদীটির স্বাদ পেয়ে- যবের মতন
আকাঙ্ক্ষা রয়েছে বেঁচে পৃথিবীর তীরে
শেষ তার দীর্ঘ হয়- দীর্ঘতর হয়ে করে সোনা আহরণ
কাজলকপোতী এই রয়ে যায় জ্যৈষ্ঠের সমীরে

হিজলের ডাল ছেড়ে কালো কাক হামাগুড়ি দিয়ে
নদীর উপরে নেমে চ’লে যায় দিগন্তের পানে
যেইখানে নদী নাই,- প্রচুর জলের গন্ধে দু’ হাত বাড়িয়ে
আমার মনের নদী তারে টেনে আনে

কোনও ক্ষুরধার পাড় তাহারে খায় না গিলে কোনও দিন
বুকে তার কোনও দিন জাগে না ক’ শকুনের চর
সঙ্ঘমিত্রা যখন সমুদ্রে নামে: দেখেছে সে- তবুও নবীন
চোখ তার আজিকার মাছরাঙা-রৌদ্রের ভিতর

আমার মনের নদী গ্যাস নয়- নয় ইলেকট্রোন
যে-সব মৃতেরা আজ হাওয়ার শরীর নিয়ে ভাসে
দেবদারু-নীলিমার ফাঁক থেকে করিছে বীক্ষণ
স্ফটিক-স্তম্ভের মতো যত মেঘ মুছেছে আকাশে

সময়ের সিঁড়ি ভুলে নেমেছে নদীর জলে- নীচে
অম্বাপালী যেই সূর্য দেখেছিল গোধূমের খেতের কিনারে
নদীর নিবিড় জলে আজও সেই প্রতিভা জ্বলিছে
জেনো কোনও চন্দ্রমল্লী হারায় না কোনও অন্ধকারে

বাংলার পাট তিল তিসি খেত- প্রান্তরের উপনিষদের মতো নির্জনতা
চিলের প্রাণের প্রিয় গাঢ় রৌদ্রে ঝিকমিক বিশাল মৃত্তিকা;-
ইহাদের পাশ দিয়ে এক ঝাঁক শালিখের মতো তার শরীরের কথা
বহে যায়,- আমার হৃদয়ে এসে হয় সে স্মরণ, হয় স্বপ্নের শিখা

হলুদ মরণ নাই কোনও দিকে- কাজলকপোতী এই হৃদয়ের নদী
পৃথিবীর কোনও পথে নাই যেন কোনও ব্যর্থ গোবি-মরুভূমি
টাইবার- মিসিসিপি- টেমস- সব শিষ্য তার, গাঢ় নদী-জননীরে যদি
চুমো দিতে চাও, প্রিয়, কুহকের সিঁড়ি বেয়ে আমার হৃদয়ে নেমে তুমি-

 

নদীটির স্বাদ পেয়ে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

দেখি তারে অন্ধকারে দীর্ঘ দেহ রূপবতী ভিক্ষুণীর মতো
চলিতেছে- চলিতেছে- যেন কোনও শ্রাবস্তীর গর্ভ থেকে নেমে
যেইখানে মঙ্গোলিয়া রক্তে আজ হতেছে বিক্ষত
অথবা যেখানে আরও গাঢ় রক্ত স্তব্ধ হয়ে গোক্ষুরার প্রাণে আছে থেমে

রুপালি বৃষ্টির শব্দে- শাল-সেগুনের গন্ধে মানবী সে-আননের জ্যোতি
সেইখানে;- বারুদের গন্ধ, হাড়, অঙ্গার, ছিন্নমুণ্ড তথাগত: সব
সুপক্ক যবের গন্ধে ঢেকে ফেলে;- জীবনের সেই এক কথা শুধু পায় পরিণতি
প্রেমিকা যা এক বার ব’লে ফেলে রাখে ঠোঁট প্রত্যুষের যুথিকার মতন নীরব।

চ’লে যায় গগনে- বাতাসে- নীল সাগরের জলে
শতাব্দীর থেকে দূর শতাব্দীর সিঁড়ির বিজনে
ইতিহাস যেখানে পাহাড় শুধু: দানবীয়- পাণ্ডুলিপি যেইখানে মরুর মতন সমতলে
এশিরিয় রূপসির হাড়ে সাদা- জীবনে রয়েছে নদী আছে সেই কথা আজ নেই আর যাহাদের মনে

পৃথিবীর দিকে চেয়ে দেখি আমি ছোট-ছোট নদীর স্ফুরণ
তার পর স্ফীত নদী-জননীরে দেখি
কত সুড়ঙ্গের রুক্ষ অন্ধকারে চুম্বকের মতো তার শুনি আলোড়ন
গঙ্গা জানে সেই কথা?- টেমস জানে?- মিসিসিপি- টাইবার সে কথা জানে কি?

যে-মানুষ এসে গেছে পৃথিবীতে- আসে নাই আজও যেই দার্শনিক রীতি
যেই সূর্য ঝ’রে গেছে- যেই প্রেম হয়ে গেছে- যেই প্রিয় উদগীরণ দেখা যাবে কাল
যে-পিপাসা মৃত্তিকার স্বর্ণে ধনী- যার চোখে বালি আর কাচমণি সেতু আর স্মৃতি
সময়ের হাতে যেই দেশ যেই যুগ শুধু বানরের-বানরীর বিচূর্ণ কপাল

সকলের মাঝখানে মানবী সে- মানবী সে- মানবীর মতো নিরবধি
আকাশের চিন্তা স্বপ্ন প্রতিভার কোনও এক সন্ধি থেকে নেমে
সুপক্ক নিবিড় শব্দে বহিয়া চলেছে এই হৃদয়ের নদী
বিস্ফোরক বিহ্বলতা হয়তো-বা এক দিন মুগ্ধ হবে সেই নদী-বনিতার প্রেমে।

 

Leave a Comment