যেইখানে আত্মা ভয় পায় কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ১৪তম খণ্ডে রচিত। যা ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

যেইখানে আত্মা ভয় পায়
কবিতা: যেইখানে আত্মা ভয় পায়
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

যেইখানে আত্মা ভয় পায়
শীতের অস্মরণীয় বায়ুর ভিতরে
চাতক সূর্যের আলো পেতে গিয়ে- তবু
চড়ুইয়ের কোলে ভেঙে পড়ে
গোধূম-খেতের বুকে লেগে থাকে রঙের শূন্যতা
কাস্তের হিসসো-হিস ফিস-ফাস আজ
নদীর ঠান্ডা জলে প্রতিধ্বনি নয়
মানুষের শরীরের ভিতরে হৃদয়
আরশির ভিতরে ঢুকে কাজ
ক’রে যায়, ব’লে যায় কথা
কেন-না সেখানে এক নিরাপদ স্থান
রয়ে গেছে- স্বর্গ-নরকের থেকে ঢের দূরে
শতাব্দীর রোলে প’ড়ে অবশেষে এখন মানুষ
(গাধা ও ঋষির সাথে) দিব্য হয়ে গিয়েছে মুকুরে।
কিন্তু সব উঁচু-উঁচু রুক্ষ গাছগুলো
যে-সময়- অবশেষে- শীতের বাতাসে
হাড়ের মতন কালো অঙ্গার-রেখায় আঁকা কার্টুন হল
অবিস্মরণীয় সব পাখি উড়ে আসে
গাছের উদ্ভিন্ন বীজ মুখে ক’রে নিয়ে
হয়তো-বা নিজেদের অজ্ঞাতসারে
ঢের দূরে গিয়ে তারা সময়ের (অবিকল) স্মৃতি
উদ্বর্তিত ক’রে তোলে- এমনই প্রতীতি
ধূসর কমলা-রঙ্ লিচেনের পাথর পাহাড়ে
সেই সব মূঢ় বীজ দিয়েছে ছড়িয়ে
কৃষকের চেয়ে বেশি স্থির সংস্থানে
কৃষি-বিভাগের চেয়ে আরও প্রতিভায়
উঁচু গাছ, নীলাকাশ, রৌদ্র, প্রেম পেল
তিরোহিত পাখিদের মধ্যস্থতায়
অনেক নিয়ম আছে নিসর্গের-
শীত নয়- শীতের প্রতীক এক রীতি;
যখন কঙ্কাল দিয়ে ভিখিরি ও কুকুরের রাজা
ভেঙে ফেলে বাজেটের নির্জন সমিতি
তাহাদের হৃদয় ও জানুর সন্ধিতে
খট-খট করে এক হাড়
সেই প্রতিচ্ছবি এসে নদীর ভিতরে চ’লে যায়

শীতের রূপক সৃষ্টি করে
শর-বনে সাত জন রূপসির মতো হাহাকার
শোনা যায় বাতাসের অলিতে-গলিতে
ক্বচিৎ একাকী লোক চেয়ে দেখে চড়ুইয়ের ডিম-ভাঙা মাঠে
অথবা বৃষ্টির মতো শিশিরের জলে
সময়ের হাত তার স্বাভাবিক ঊর্ধরেখা নিয়ে
প’ড়ে আছে অপরূপ- এক মাইল মাঠের ফাটলে।
যখন সমুদ্র তার নীলিমার দিকে
চ’লে গেছে মানুষের সংস্পর্শ ছেড়ে
বিবর্ণ বালির ‘পরে পরগাছা, কঙ্কাল, ভুসির
স্বকীয়, স্বতন্ত্র বুদ্ধি ক্রমে ওঠে বেড়ে
সিগারেট-খণ্ড, খোসা, ডিম, বমি, ক্বাথ
এরোপ্লেনের পাখা, টিন, ক্যানেস্তারা
পিছল বালির ‘পরে লেগে থাকে সাধু প্রতিভায়
তখন সমুদ্র তার আকাশকে চায়
অনুভব ক’রে যায় করুণার অবতার ছাড়া
টানা-পোড়েনের সুরে সূর্যের সপ্তকে কেউ তাঁত
কী ক’রে বুনন ক’রে বৈকুণ্ঠের দেশে
কী ক’রে বুনন ক’রে রেকের খাদের গভীরে
চ’লে যাবে- সিন্ধুসারসের ডাকে চুপে ফিরে এসে
জিনিসের মূল্য দেয়- আধো-বিস্মৃতিরে।
এ-সব বিভিন্ন সুতো দেখে গেছি আমি
নিজের নিয়মে মুক্ত হয়ে তবু অপরের নিয়ম-অধীন
হয়ে গিয়ে- চোখের দেখা ও হাত ছেড়ে দিয়ে কোনও-কোনও সুতো
(আলোর ফিকিরে প’ড়ে) উইয়ের মতন মিহিন।