রুটি বিক্রেতার ঘরে জন্মেছে যে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

রুটি বিক্রেতার ঘরে জন্মেছে যে কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ৮ম খণ্ডে রচিত। যা ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

 

রুটি বিক্রেতার ঘরে জন্মেছে যে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

রুটি বিক্রেতার ঘরে জন্মেছে যে

কবিতা: রুটি বিক্রেতার ঘরে জন্মেছে যে
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

 

রুটি বিক্রেতার ঘরে জন্মেছে যে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

রুটি-বিক্রেতার ঘরে জন্মেছে যে- মনে কোরো না সে হিটলার কিংবা মুসোলিনি
কিংবা ম্যাক- এদের নিকট আমরা সকলেই আজ ঢের ঋণী
পৃথিবীর খবরের বৈদ্যুতিক তার
এরাই চালায় আজ কৌশোরের দিনগুলো পার হয়ে গেলে
প্রেম যেন স্যাঁতসেঁতে মনে হয়- তবু অন্য মাছরাঙা রগড় না পেলে
দিন-রাত্রি মনে হয় গর্তের মতন অন্ধকার

ভোরের কাগজ যেই ঝপ্ ক’রে মেঝের উপরে এসে পড়ে
কারু-কারু মনে হয় আরণ্যক সজারুর আঁধার বিবরে
শিকারির লাঠি দিল খোঁচা
তবুও আমার হাতে এল যেন চীনেবাদামের ঠোঙা তুলে নিয়ে বাইনোকুলার
আবার হয়েছে জড়ো নামজাদা ঘোড়াগুলো- ঘোড়ার সওয়ার
মুহূর্তেই দৌড় শুরু ক’রে দেবে চোঁ-চাঁ

দেখা যাবে সমুজ্জ্বল চোখটারে নীলাভ গগলস দিয়ে ঢেকে
খুলির ভেতরে কিছু পেঁচার ধূসর ঘিলু মেখে
যেন এক নির্জন উঁচু গাছে ব’সে
কী ক’রে ইঁদুরগুলো গোলাজাত স্বর্ণমান করে প্রদক্ষিণ
হাসি গল্প মৌথুনে সারা-রাত নিজেদের ভাবে সমীচীন
ঝাঁপ দিয়ে অকস্মাৎ ভয় মৃত্যু ঝেড়ে ফেলে স্প্রিঙের পাপোশে

দেখে-দেখে পেঁচা যেন ধূসর চশমা-জোড়া খুলে ফেলে তার
অশ্বত্থের মগডালে ব’সে থাকে নিরীশ্বর- কী-একটা-কী-যে-অবতার
হাসির কী উপহাসি- করুণার?
দিনের ও-পারে দিন কেবল আসিতে আছে এই পৃথিবীতে
তবুও নতুন ভোরে ব’সে আছে প্রথম শ্রেণীতে
সেইখানে চির-কাল বসিবার অভ্যাস যার।

আমি জানি দাড়ি কামাবার ব্লেড- নতুন- নতুনতর মডেলের- সব-চেয়ে বেশি চিরঞ্জীবী
নিছক করুণা এক বুড়ো মেয়ে- আইবুড়ো- মৃত বাসমতি ধানে কেন আর বাঁধিতেছ নীবি
বুদ্ধিজীবী ব’লে তারে পিঠ চাপড়ায়ে দিয়ে ঠেলে
তখনই করুণা জাগে- অবতার হয়ে যেন- বিষকুম্ভ ঢেকে ফেলে মধুর মতন
‘কী-বা তাতে আসে-যায়: কুষ্ঠরুগীদের দেহে থাকে যদি মেনকার মতো কোনও মন
উনুন জ্বালানো যায় উর্বশীর দেহে কুষ্ঠাশ্রিত মন পেলে-‘

এই সুর বাজিতেছে- শুনি আমি- কুষ্ঠাশ্রমে রুগীটির প্রাণে যেন রোজ
অর্থনীতি এত বড়ো হয়ে গেল এই যুগে- দেহস্বাচ্ছন্দ্যের মতো গভীর গরজ
মূলে তার বীজ হয়ে র’য়ে গেছে ব’লে
আমারও সঠিক ব’লে মনে হয় মানুষের এ-সব পিপাসা
গালে গর্ত হলে বুড়ো ধ’রে নেয় উপনিষদের মতো ভাষা
ভুল ধরা প’ড়ে যায় কাগজে বীচমস-পিল বিজ্ঞাপিত হলে।

তাই আমি দু’ পকেটে হাত রেখে- নেই কিছু- তবু ভয় পকেটমারের-
বাতাসের মতো স্বচ্ছ- ব্রহ্মাস্বাদ- কাঁচি তবু আজও নিত্যকার কারবার
সেই স্থূল মায়াবীনি রমণীর মতো সহিষ্ণুতা চাই
শতরঞ্জি বিছায়ে রয়েছে সব চারি-দিকে- ঢের-ঢের জনতার ভিড়
গভীর নীলাম্বু গান, লন্ঠন-লেকচার, পুরাতন ছবি লিচ্ছবির
এক্সটেনশন-লেকচার, প্রফেসর, দামি নেকটাই

এইসব গাঢ় গল্প শুঁকিতেছি- কাঁচি তবু সিগারের অবশেষ হল অধিগত
‘দ্য আনসার টু দি ফার্স্ট পার্ট অফ দ্য কোশ্চেন বিইং ইন দি নেগেটিভ’- শুনে মুখ্যত
বলিছে জড়োয়া শাল উঁচু মঞ্চ থেকে
অটুট গলার জোরে সর্বজনীন শ্বেত প্রতিভায়- দুষ্যন্তর ছেলের মতন
অপ্সরিরা ওড়াউড়ি করিতেছে- হয়তো-বা নাম তার সর্বদমন
কোনও দিন চড়ে না ক’ নগরীর ডবলডেকার কোনও ডেক’এ

 

রুটি বিক্রেতার ঘরে জন্মেছে যে । জীবনানন্দ দাশ । পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থ,২০০৫

 

মোটর রয়েছে ভিড়ে- পেঙ্গুইন-দ্বীপ-জ্যোৎস্না- কলকাতা- আমার দৃষ্টি তবে রাহু
ধরাচূড়া প’রে- গোঁফ চুমরায়ে- ড্রাইভারগুলো বীরবাহু
মেঘের আড়ালে তবে আমি ইন্দ্রজিত
ভাবি আমি মনে-মনে;- তবু জানি এক লাখ বিভীষণ সব কথা জানে
গভীর বিষয় নিয়ে শুরু করি যদি আমি- নিকুম্ভিলা যজ্ঞের সমানে
হিতে হয়ে যাবে ঢের- ঢের বিপরীত

তবু যেন মনে হয় সকলেরই আঁজলার থেকে শুধু চুঁয়ে পড়ে জল
আমি ভাবি: ‘ওরা ভাবে স্বর্ণরেণু-ভরা এই নদীটি প্রাঞ্জল’-
ওরা ঢের অন্য কথা ভাবে
এনেছে অনেক উট- অনেক গভীর দাম দিয়ে
মরুভূর সূর্য গিলে- হাঁপানি রুগীর মতো দিন-রাত পাঁজরা চাগিয়ে
তবু সব কঙ্কালের গুঁড়ো হয়ে যাবে।

বিচারক উচ্চাসন থেকে নেমে- পরচুলা খুলে ফেলে- তার পর যায়
হয়তো নিজের ঘরে- কিংবা কোনও গণিকার ঊর্ধ্ব আখড়ায়
মাথার চাঁদিতে তার একটাও চুল নাই- তাই
চুমো দিতে গেলে তবু ঋজু গণিকার
গলায় কেমন কফ আটকায়ে যায় বার-বার
ক্লান্ত হয়ে কথা ভেবে দেখে নেকটাই

কমিটি-মিটিঙে ব’সে কুকুরকে হাড় দিয়ে- বাজেট করেছে গাড়ি-গাড়ি মাংসময়
বাথরুমে তবুও স্নাতক অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র ছাড়া আর কেউ কিছু নয়
ফুলেল সাবান তেল চৌবাচ্চার জল
এরা পূর্ব-মীমাংসার মূলসূত্র- জীবনটা সঞ্চয়ের মুখোমুখি- স্থবির- অগ্রিম
আরও অন্ধকার রাতে তৃতীয় পক্ষের বধূ যেন লৌহভীম
আসল পাণ্ডব ঐ রাস্তায় জড়ো করিতেছে গণবল।

বইয়ের দোকান খুলে ফেঁপে গেল বিমলা দালাল
পরমহংসর শিষ্য- গীতা পাঠ করে চির-কাল
টেবিলের মাছিটাও চুরি করে যারা
টের পায়;- বেদম প্রহার দিয়ে ভেঙে দেয় তাহাদের মাজা
তবুও সেই আইবুড়ো রোজ রাতে কড়িবর্গাকে বলে: আমি এক খাজা
আমাকে চেনে না কেউ রাত দেড়টার এই বালিশটা ছাড়া।

আর-এক হেঁয়ালি নাও: যে ছিল নিজের গর্তে সাপের মতন
জন্মেজয় যজ্ঞ করিবার আগে- কোনও দিন পড়ে নাই প্রবাসীরও কোনও বিজ্ঞাপন
জানে না ক’ মেট্রো বা টোকালন কাকে বলে-
পৈতৃক পুঁজি টাকা- বিনা বাক্যব্যয়ে সব স’রে গেল দেখে
দেখিল বরাতে আছে আগুনের মেঘ যারা উড়ে আসে লাখো লোক থেকে
পুরুষেরা সারা-দিন হাসাহাসি করিতেছে মেয়েলি মহলে
★★★★★
চারি-দিকে কৃতকর্ম কৌরবের এত সব ভিড়- এত সব চানাচুর রোজ-বিক্রির
চামচ, টেবিল, চুমো, রাষ্ট্রভাষা, দেবীপীঠ,- বেলা তিনটায় রুগী ভীষণ অস্থির
ছয়টায় প্ল্যানচেটে- কে যেন বলিল কেশে- ধরা যাবে ভূত
শোনো বধূ জননী দুহিতা যারা দাঁড়ায়ে রয়েছ এই বরফের মতো হিম শবের সকাশে
এত ব্যস্ত মানুষটা ম’রে গেল বাথরুমে সাবান ঘষিতে গিয়ে সস্তা নাভিশ্বাসে
সাবানের ফেনায় ফানুসগুলো ইন্দ্রধনুকের রঙে এখনও মজুত

চেয়ে দেখ- নিম্নে- নাসিকার নিচে- নিমিষেই আসিবে সে ফিরে
স্বর্গীয় কাদাগুলো হঠাৎ পাপোশে ঝেড়ে- হ্যাটকোট প’রে সশরীরে
এই কামরার খোপে- এই দেয়ালের গায়
বড়ো-বড়ো টেবিলের গাঁইতিতে- ভুরি-ভুরি দলিলের মাঝে
আবার বসিবে এসে- ঘণ্টায় সাত বার লোকটার টেলিফোন বাজে
সাড়ে-তিনটায় গেছে- ফিরে এলো সাড়ে-চারটায়।

 

Leave a Comment